Prionti
অঞ্জনার মেয়েটি খুব সুন্দর হয়েছে, যেন স্রষ্টার নিজ হাতে তৈরি। দীপক বাবু, বাসন্তী মেয়েটিকে কোলে নেবারও অনেকক্ষণ পর প্রিয়ন্তী যখন কোলে নিল ততক্ষণে জামাই বাবু কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
জামাই বাবুকে শুনিয়ে প্রিয়ন্তী বলল, বাচ্চা তো খুব সুন্দর হয়েছে জামাই বাবু।
হবে না, আমার বাচ্চা, আমাদের রক্তের মধ্যে আভিজাত্য আছে। তুই দেখিস আমার মেয়েও একদিন অনেক বড় হবে।
আমিও তাই আশীর্বাদ করি।
ততক্ষণে দীপক বাবু আর বাসন্তী চলে গেছে। প্রিয়ন্তী আর জামাই বাবুর কাছে বিদ্যুৎ এসে দাঁড়ালো, আমাকে দাও।
জামাই বাবুর ছোট ভাই বিদুৎ চক্রবর্তী এ বছর বি.এ পাস করেছে। আপাততঃ কৃষিকাজ দেখাশোনা করছে, ভবিষ্যতে চাকরির প্রত্যাশায় বই-পুস্তক এখনো ছেড়ে দেয়নি। বিভিন্ন দপ্তরে চাকরির দরখাস্ত করছে। তার আশা বি.এ পাস করেই একদিন সে বড় অফিসার হবে। তবে চেহারায় জামাই বাবুর মতোই রাজকীয়।
প্রিয়ন্তী খেয়াল করেছে বিদ্যুৎকে বাচ্চাটাকে দেওয়ার সময় ইচ্ছা করেই প্রিয়ন্তীর হাত ষ্পর্শ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে বলেছে, সরি।
প্রিয়ন্তী রেগে গেল। সে চোখ মুখ লাল করে নিতান্ত ভদ্রতা বশতঃ বলল, না, ঠিক আছে। কিন্তু সে বুঝতে পারল বিদ্যুৎ অনিচ্ছাকৃত নয় ইচ্ছাকৃতই তার হাত ষ্পর্শ করেছে। সে মনে মনে বলল, মিঃ বিদ্যুৎ আপনি হয়ত জানেন না, মেয়েরা গায়ে জড়ালেই বুঝতে পারে সাপ না লতা।
জামাই বাবু তাদের কথা বলতে দেখে চলে গেছে।
তুমি যেন এবার কোন ইয়ারে?
অনার্স সেকেণ্ড ইয়ারে।
তাহলে তো আর বেশিদিন নেই।
তারমানে?
পরে শুনবে?
আপনি বলুন এখনই শুনি।
বিদ্যুৎ ইতস্ততঃ করল, প্রিয়ন্তী আর কোন আগ্রহ দেখাল না।
কয়েকদিন কেটে গেল। প্রিয়ন্তী খেয়াল করেছে বিদ্যুৎ প্রায় সব সময় কাছাকাছি থেকে তাকে অনুসরণ করে। বেশিরভাগ সময় তার সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা করে, ইতোমধ্যে মোটর সাইকেলে করে দিনাজপুর কিংবা স্বপ্নপুরী বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করেছে। বিষয়টি সবাই দেখলেও সবাই যেন বিদ্যুৎকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু প্রিয়ন্তী কাউকে কিছু বলেনি সে এই অবস্থার শেষ দেখতে চায়।
অবশেষে প্রিয়ন্তী যেদিন পার্বতীপুর থেকে তাদের গ্রামের বাড়ি ফিরবে সেদিন প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ পেল। অঞ্জনা আর জামাই বাবু প্রিয়ন্তীকে তাদের ঘরে ডাকল। প্রিয়ন্তী প্রথমে কিছু বুঝতে পারল না।
জামাই বাবুই প্রথমে কথা তুলল, প্রিয়ন্তী কথাটা তোকে আরো আগে বলা উচিত ছিল কিন্তু আজকাল, আজকাল করে বলা হয়নি।
কী কথা জামাই বাবু?
আমাদের বিদ্যুৎ আছে না, ওর সঙ্গে তোমার বিয়ের ব্যাপারে আমরা একটা চিন্তা-ভাবনা করেছি। বাবা-মা সবার সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তাঁরাও এ বিয়েতে রাজি আছে।
প্রিয়ন্তী যেন আকাশ থেকে পড়ল, বিদ্যুৎদা’র সঙ্গে বিয়ে আমার!
অঞ্জনা বলল, হ্যাঁ, তোর সঙ্গে ঠাকুরপোর বিয়ে হলে খুব ভালো হবে, চেহারা দেখিস না একেবারে রাজপুত্রের মতো। আমরা দু’বোন এক সঙ্গে থাকবো।
প্রিয়ন্তী এক মুহূর্ত ভেবে নিল তারপর বলল, দিদি আমার তো এখনো লেখাপড়াই শেষ হয়নি। আগে লেখাপড়া শেষ করি তারপর না হয় বিয়ের কথা হবে।
জামাই বাবু বলল, ওর বিয়ের জন্য কনে দেখা হচ্ছে তো, অনেক পণের প্রস্তাব আসছে কখন আবার বিয়ে হয়ে যায়, তাই আমি বলছিলাম আগে তোর সঙ্গে বিয়েটা হয়ে যেত তারপর তুই আবার পড়াশোনা করতিস?
হ্যাঁ তোর জামাই বাবু তো ঠিকই বলেছে, অঞ্জনা জামাই বাবুর কথাকে সমর্থন করল।
প্রিয়ন্তী মৃদু কণ্ঠে বলল, না দিদি আমি আগে লেখাপড়া শেষ করব, তারপর বিয়ে।
অঞ্জনা বলল, সবার সঙ্গে কথাবার্তা এক রকম পাকাপাকিই ছিল, ভেবেছিলাম তুই রাজি হবি। না তুই রাজি হলি না, এরকম ধনী পরিবারের রাজপুত্রের মতো ছেলের জন্য কি মেয়ের অভাব হবে?
প্রিয়ন্তী একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, আমিও তো তাই মনে করি দিদি, দাদার জন্য ভালো মেয়ের অভাব হবে না। আর তুমিও একজন নতুন জা পাবে।
থাক, থাক তোকে আর বলতে হবে না। দেখি কত বড় ঘরে তোর বিয়ে হয়?
প্রিয়ন্তী অঞ্জনার কথার কোন প্রতিবাদ করেনি, ধীর পদে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

পার্বতীপুর থেকে ফিরে রাতেই প্রিয়ন্তী সুশান্তকে ফোন করল, হ্যালো সুশান্ত।
প্রিয়ন্তী তুই কেমন আছিস? সুশান্তর কণ্ঠে উৎকণ্ঠা।
ভালো নেই রে।
কেন? কোন অসুখ করেছে?
আরে মরলে তো বেঁচেই যেতাম, তারচেয়ে অনেক বড় সমস্যা।
আমাকে বল।
অনেক বড় সমস্যা ফোন বলা যাবে না, কাল এসে আমি তোকে বলব, তুই ভালো আছিস?
ভালো নেই, তুই নেই সব সময় আমার শুধু তোর কথা মনে পড়ছিল, আমি এ ক’দিন নানান আজেবাজে স্বপ্ন দেখছি।
আজে-বাজে না, তুই সব ঠিক স্বপ্নদেখেছিস?
প্রিয়ন্তী তুই কবে আসছিস?
আগামীকাল সকালের ট্রেনে।
আমি তোকে নিতে স্টেশনে আসবো?
আসিস।
পরদিন সকালের ট্রেনে প্রিয়ন্তী রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে। ট্রেন যখন বিরামপুর ছেড়েছে তখন সুশান্ত ফোন করেছে, হ্যালো প্রিয়ন্তী।
হ্যাঁ সুশান্ত বল।
সুশান্ত মোবাইলে ট্রেনের শব্দ পেল তারপরও জিজ্ঞেস করল, ট্রেনে উঠেছিস তো, না?
হ্যাঁ।
এখন কোথায়?
বিরামপুর, কেবল ট্রেন ছাড়লো।
প্রিয়ন্তীর চোখের সামনে বার বার করে সুশান্তর ছবিটা ভেসে উঠছে। সুশান্ত গ্রাম্য উচ্চ বিত্ত পরিবারের ছেলে, দুই ভাই’র মধ্যে সে ছোট। বাড়িতে অনেক জমি-জমা আছে। প্রতিমাসে বাড়ি থেকে অনেক টাকা আসে কিন্তু তারপরও সুশান্ত টিউশনি করে। জিজ্ঞেস করলে বলে, টিউশনি করলে বিদ্যাচর্চা থাকে। লেখাপড়া শেষ করে যেভাবেই হোক তাকে একটা চাকরি জোগাড় করতে হবে আর চাকরি জোগাড় করতে চাইলে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা তো পড়তেই হবে সঙ্গে দু’য়েকটা টিউশনি করলে পড়ানোরপ্রয়োজন নিজেকেও লেখাপড়া করতে হয়।
সুশান্ত সহজ-সরল, প্রিয়ন্তীর প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস, প্রিয়ন্তী যদি কোন মিথ্যা কথাও বলে তবুও সে কোন প্রতিবাদ ছাড়াই বিশ্বাস করে। কোন কারণে প্রিয়ন্তী রাগ করলে সে অবোধ ছেলের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
সুশান্তর সামর্থ্যও আছে, সাধও আছে। প্রায়ই প্রিয়ন্তীসহ বেড়াতে যায়। যেদিন বাড়ি থেকে টাকা আসে বা টিউশনির টাকা পায় সেদিন দুজনে কোন ভালো একটা রেস্টুরেণ্টে বসে খাবার খায়, আড্ডা দেয়। প্রিয়ন্তীকে কসমেটিক্সের দোকানে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন ধরণের কসমেটিক্স কিনে দেয়। অনেক সময় প্রিয়ন্তী রেগে যায়, তখন সুশান্ত বলে, তুই রেগে গেলে আমার খুব ভালো লাগে, বুঝলি?
সুশান্তর মনটা উদার, মনের মধ্যে অহংকার বলে কিছু নেই, খুব সহজে মানুষকে আপন করে নিতে পারে। যে কারো বিপদে নিজের বিপদ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমনি নানান কথা ভাবতে ভাবতে প্রিয়ন্তীর মোবাইলের রিং বেজে উঠল।
সুশান্ত মোবাইল করেছে, প্রিয়ন্তী রিসিভ করল, হ্যালো সুশান্ত।
প্রিয়ন্তী তুই কোথায়?
নাটোর পার হলাম, আর বেশি সময় লাগবে না।
আমি স্টেশনে এসেছি, তুই ট্রেন থেকে নেমে আমাকে দেখতে পাবি।
এত আগে এসেছিস কেন?
ভাবলাম ট্রেন যদি আগে আসে।
প্রিয়ন্তী মনে মনে হাসলো, সুশান্ত জীবনে কোনদিনদেখেছিস, ট্রেন কখনো আগে আসে?
তাছাড়া সময় কাটছিল না, তোকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে, তাই আগে এলাম।
তাহলে আর কী করবি? বসে বসে ভগবানের নাম জপ কর।
চলবে…
আমার এই উপন্যাসটি প্রথম থেকে পড়তে ক্লিক করুন:প্রিয়ন্তী-০১

GD Star Rating
loading...
GD Star Rating
loading...

জিল্লুর রহমান সম্পর্কে

চোখের সামনে যেকোন অসঙ্গতি মনের মধ্যে দাগ কাটতো, কিশোর মন প্রতিবাদী হয়ে উঠতো। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতো কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে। ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে, নির্যাতন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা। কবিতার পাশাপাশি সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে শুরু হলো ছোটগল্প, উপন্যাস লেখা। একে একে প্রকাশিত হতে থাকলো কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস। প্রকাশিত হলো অমর একুশে বইমেলা-২০১৬ পর্যন্ত ০১টি কাব্যগ্রন্থ, ১৭ টি উপন্যাস এবং ০১ টি ধারাবাহিক উপন্যাসের ০৩ খণ্ড। গ্রন্থ আকারে প্রকাশের পাশাপাশি লেখা ছড়িয়ে পড়ল অনলাইনেও। লেখার শ্লোগানের মতো প্রতিটি উপন্যাসই যেন সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। সর্বশেষ প্রতিচ্ছবিটি প্রকাশিত হয় অমর একুশে বইমেলা-২০১৭।
এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের,লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর।
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে সাহিত্য-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

২ টি মন্তব্য প্রিয়ন্তী-০৪ (সংস্কারের প্রাচীর ভাঙ্গা তরুণী …

  1. মুরুব্বী বলেছেনঃ

    ‘সংস্কারের প্রাচীর ভাঙ্গা তরুণী’ উপন্যাসের খণ্ড পর্ব পড়লাম।
    শুভেচ্ছা জানবেন প্রিয় জিল্লুর রহমান ভাই। ধন্যবাদ।

    GD Star Rating
    loading...

মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।