এদেশ ওদেশ ১৪

(শুরু করেছি ভারত – বাংলাদেশ – পাকিস্তানের ময়নাতদন্তমূলক নিবন্ধ “এদেশ ওদেশ”। লেখাটি আগে এক‌টি কাগজে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমার মনে হয় ২০১৫ সালে লেখা এই নিবন্ধ এখনো প্রাসঙ্গিক। আজ চতুর্দশ পর্ব।)

ঠিক এই সময়ে এলাহাবাদ হাইকোর্টের এক ঐতিহাসিক রায় বদলে দিল গণতন্ত্রের গতিপথ। ১২ই জুন ১৯৭৫ জনৈক রাজনারায়নের দাখিলিকৃত মামলার রায়ে এলাহাবাদ হাইকোর্ট ঘোষণা করল, ইন্দিরা অবৈধভাবে দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে ১৯৭১ এর নির্বাচনে রায়বেরিলী থেকে জয়লাভ করেছিলেন। তাই শাস্তিস্বরূপ তাঁর সংসদীয় সদস্যপদ বাতিল সহ ছবছর নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হল। ত্রাহি ত্রাহি রব উঠল কংগ্রেসে। কারন তখনকার কংগ্রেস সভাপতি দেবকান্ত বড়ুয়ার “ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া” বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল দলের আপামর সদস্য। ত্বড়িৎ ডাক পড়ল আইনজ্ঞ সিদ্ধার্থর। আইনের নথি ঘেঁটে সিদ্ধার্থ যে নিদান দিলেন, ইন্দিরা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে তার প্রয়োগ করলেন। ভারতবর্ষ ডুবে গেল গণতন্ত্রের গভীর লজ্জার অধ্যায়ে- জারী হল জরুরী অবস্থা; এমারজেন্সি।

ভূমি ভাগ হয় না। মানুষই তাকে বিভিন্ন দাগ টেনে বিভক্ত করে নিজের কুমতলব চরিতার্থের উদ্দেশ্যে। কিন্তু চরিত্রগত মিল থেকে যায় সব টুকরোর মধ্যেই। ভারত যখন অন্ধকারে ডুবছে, তখন তার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া অন্যদেশও তলিয়ে যেতে বসেছে সেই একই কালোয়। বলা যায় প্রায় একই সময়ে ভারতে ইন্দিরা, পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টো এবং বাংলাদেশে মুজিবর রহমান তাঁদের রাজনৈতিক কেরিয়ার শুরু করেন। ভাগ্যের পরিহাস তাঁদের তিনজনকেই মিলিয়ে দিয়েছে অস্বাভাবিক অকাল প্রয়াণে। আশ্চর্যজনক ভাবে তিনজনকেই হত্যার পিছনে কারন হিসেবে কাজ করেছে ক্ষমতা দখলের অত্যাধিক লোভ।

যখন থেকে পাকিস্তানে গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরে মিলিটারী স্বৈরশাসন আমদানি হলো, তখনই উপমহাদেশের স্থায়ী অস্থিরতার ভবিষ্যত জন্ম নিয়েছিল। আয়ুব খান জমানা শেষে ইয়াহিয়া খান জমানা এবং বাংলাদেশের জন্মকে কাজে লাগিয়ে সেদেশে তৎপর হয়ে উঠলো কট্টরপন্থী ধর্মীয় দল জামাত-ই-ইসলামী। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ভেঙে বেরিয়ে আসার আসল কারন চিহ্নিত করার কোনো চেষ্টাই দেখা গেলনা সেখানে। পাকিস্তানী শাসকদের অকর্মণ্যতা, শোষণ, ঔপনিবেশিক আচরণ ও জবরদস্তি ইত্যাকার মূল কারনের অভিঘাত আড়াল করে দায় চাপানো হল, ইসলামিক পথ থেকে বিচ্যুতি এবং ইয়াহিয়া খানের মদ্যপানে আসক্তি। অথচ এই দুই কারনই যে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও হাস্যকর তা বোঝার ক্ষমতা সে দেশের সাধারণ মানুষের ছিলনা অশিক্ষার জন্য।

১৯৭১ এ যুদ্ধে লজ্জাজনক পরাজয়ের পরে প্রধাণমন্ত্রীর আসনে বসলেন জুলফিকার আলি ভুট্টো। ক্ষমতায় বসেই তিনি শ্লোগান তুললেন, “Islam is our faith, democracy is our polity, socialism is our economy” । যদি সত্যিই এই নীতি কার্যকর করা যেত তাহলে হয়তো শুধু পাকিস্তান নয়, সমগ্র উপমহাদেশ আজকের এই ভয়ংকর অস্থিরতার হাত থেকে রেহাই পেয়ে সত্যিকারের উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারত। কিন্তু ভুট্টোর এই প্রতিশ্রুতির অন্তরালে ইতিহাসের অট্টহাসি সেদিন শোনা যায়নি।

আগেই বলা হয়েছে বাংলাদেশ বিভক্তিকরনের দায় হিসেবে দুই অযৌক্তিক কারন কিন্তু রীতিমত পাকা ভিত গড়ে তুললো মৌলবাদের। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে মান্যতা পেতে শুরু করলো ঐ তত্ত্ব। বিদ্রোহ ছড়িয়ে গেল এমনকি সেনার মধ্যেও। ১৯৬৫ র পরে সমাজের নিম্নস্তর থেকে নিযুক্ত কিছু জুনিয়ার অফিসার এই ইস্যুতে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করল। পর্দার আড়ালে সেই প্রথম জামাতের ক্ষমতা দখলের প্রয়াস। কিন্তু তখনো সেনার সর্বস্তরে জামাতের সেরকম প্রভাব না থাকায় অচিরেই বিদ্রোহ দমিত হলো।

(এরপর আগামীকাল)

GD Star Rating
loading...
GD Star Rating
loading...
এদেশ ওদেশ ১৪, 5.0 out of 5 based on 1 rating
এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের,লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

১টি মন্তব্য (লেখকের ০টি) | ১ জন মন্তব্যকারী

  1. মুরুব্বী : ১১-০৫-২০২২ | ১২:২৬ |

    “Islam is our faith, democracy is our polity, socialism is our economy.” যদি সত্যিই এই নীতি কার্যকর করা যেত তাহলে হয়তো শুধু পাকিস্তান নয়, সমগ্র উপমহাদেশ আজকের এই ভয়ংকর অস্থিরতার হাত থেকে রেহাই পেয়ে সত্যিকারের উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারত। কিন্তু ভুট্টোর এই প্রতিশ্রুতির অন্তরালে ইতিহাসের অট্টহাসি সেদিন শোনা যায়নি। Frown https://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_good.gif

    GD Star Rating
    loading...

মন্তব্য করুন