১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশে সুবিধাবাদের খিচুরির ডেগের রাজনীতির উত্থ...

১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশে সুবিধাবাদের খিচুরির ডেগের রাজনীতির উত্থান ঘটে
——————————————————————————–

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বাঙালির তথা বাংলাদেশের মানুষের ইতিহাসে একটি কঠিন অধ্যায়। একটি কলঙ্কময় অধ্যায়। বিশ্বের  ইতিহাসে বর্বরতম ন্যাক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এদিন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার অগ্রনায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং বাংলাদেশের যুব সমাজের আইকন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স বা মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান নেতা, যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেয়া হয়।

ঘাতকচক্র, ষড়যন্ত্রকারী চক্র সেদিন আনন্দ উল্লাসে, হত্যার রক্তের উল্লাসে মেতে উঠলেও বাংলার ভাগ্যাকাশে নেমে আসে কালো ছায়া। পলাশীর হৃদয়বিদারক ইতিহাসের মত আরেকটি ইতিহাস রচিত হয় ঐ দিন। বাংলাদেশের মানুষ আকড়ে ধরে দুঃস্বপ্নকে। স্থবির করে দেয়া হয় বাংলার স্বপ্নের স্বাধীনতার প্রাণ স্পন্দনকে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে দেশীয় ষড়যন্ত্র যতটুকু না ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। এই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জাল থেকে বাংলাদেশের তৎকালীন নেতাদের বেরিয়ে আসা কঠিনতর ছিল। বিদেশী এবং দেশী ষড়যন্ত্র বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারকে ক্ষত বিক্ষত করে ব্রাশফায়ারের বুলেটে। ষড়যন্ত্রকারী চক্র কালিমা লেপন করে দেশের সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনীর গায়ে। একের পর এক স্বৈরশাসনের দিকে ধাবিত হয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সংবিধানে স্বপ্নের গণতন্ত্র, ত্রিশ লক্ষ শহীদের জীবনের বিনিময়ে এবং অসংখ্য মা- বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন বাংলার গণতন্ত্র ভুলণ্ঠিত হয় স্বৈরতন্ত্রের বেড়াজালে। চূড়ান্ত হত্যার শিকার হয় গণতন্ত্র, সমরিক শাসকদের জাঁতাকলে।

যদিও অনেক লেখক মনে করেন, ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ (বাকশাল) গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন কায়েম করে বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের উত্থান ঘটান বঙ্গবন্ধু নিজেই।’

আবার অনেক লেখক মনে করেন,‘ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সে সময় বাকশাল গঠন না করলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়তে পারতো। যা বাংলাদেশের জন্য এবং বাংলাদেশে মানুষের কষ্টার্জিত স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারতো।’

অনেক লেখকরা দাবি করেন, বঙ্গবন্ধুর সময়ে উচ্চ পদস্থ এবং নিম্ন পদস্থ সরকারি চাকরিজীবীরা এত পরিমানে অনিয়ম এবং দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে যে বঙ্গবন্ধু নিজেই তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেয়ে যান। যা পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু হত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’

ইতিহাস বিশ্লেষণের ধারায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড কয়েকটি ঘটনা সমানে তুলে ধরছি যা পরিষ্কার করবে বাংলাদেশে অতীতে ঠিক কি ঘটে গেছে-

ঘটনা-১

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বাংলাদেশের জাতির জনক, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় নিজ দলীয়, নিজ দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট সপরিবারে ব্রাশফায়ারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তাঁরই অনুগত সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে।

ঘটনা-২

শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর নিরাপদ জেলখানায় রচিত হয় কলঙ্কিত ইতিহাস। সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে সেদিন জেলখানায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডে শিকার হন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী নেতা- বাংলাদেশের সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর প্রধানমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, বাংলাদেশের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান।

ঘটনা-৩

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করায় অবদান রাখা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল আবু তাহের ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সামরিক আদালতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ছাড়াও স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফসহ আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিককে হত্যার শিকার হতে হয় জিয়াউর রহমানের শাসনকালে।

ঘটনা-৪

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান, সাবেক রাষ্ট্রপতি, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সেনাবহিনীর সদস্য হয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় নিজ দলীয়, নিজ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ১৯৮১ সালের ৩০ মে নৃশংসভাবে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে ব্রাশফায়ারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তাঁরই অনুগত সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে।

ফলাফল :

বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক, ইতিহাস বিশ্লেষক, সাপ্তাহিক বাংলাবার্তা সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান তাঁর লেখা বিভিন্ন সময়ের নিবন্ধগুলোতে তিনি লিখেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, জেল হত্যাকাণ্ড, কর্ণেল তাহের হত্যাকাণ্ড, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। যার ফলশ্রুতিতে জিয়াউর রহমানকেও হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছিল তাঁরই অনুগত সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যদের হাতে।

ইতিহাস বলে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর তিনজন রাষ্ট্রপতি, দুইজন প্রধানমন্ত্রী নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিপথগামী সদস্যদের হাতে। যা কোন দিন স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ স্বপ্নেও ভাবতে চাননি, সেই হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোই ঘটেছে বাংলাদেশের ইতিহাসে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশকে করেছে কলঙ্কিত। আর সেই কলঙ্কময় ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটুক সেটাই প্রত্যাশা। সুবিধাবাদীরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের কাছ থেকে সুবিধা নিল কিন্তু তাদের মনে রাখল না। সুবিধাবাদীরা শেখ হাসিনার কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছে এবং খালেদা জিয়ার কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছিল। সুবিধাবাদীরা দলের সুবিধাজনক সময়ে ১৫ আগষ্ট পালন করে কয়েক ডেগ খিচুরি আর মাংস বিলায়, আবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে সেই ডেগ লাথি দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে। সুবিধাবাদীরা দলের সুবিধাজনক সময়ে ৩০ মে পালন করে কয়েক ডেগ খিচুরি আর মাংস বিলায়, আবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে সেই ডেগ লাথি দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে। সুবিধাবাদীরা সুবিধা খোঁজে, সুবিধাবাদীরা কাউকে মনে রাখেনি সামনেও মনে রাখবে না।

GD Star Rating
loading...
GD Star Rating
loading...
এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের,লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

১টি মন্তব্য (লেখকের ০টি) | ১ জন মন্তব্যকারী

  1. মুরুব্বী : ২২-০৮-২০২১ | ১৪:৫৩ |

    সুবিধাবাদীরা কাউকে মনে রাখেনি সামনেও মনে রাখবে না। অসংখ্য হৃদয়বিদারক ঘটনাপ্রবাহ ঘটেছে আমাদের এই বাংলাদেশের ইতিহাসে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশকে করেছে কলঙ্কিত। আর সেই কলঙ্কময় ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটুক সেটাই প্রত্যাশা আমরা সবাই করি। পেছনে নয়; আমরা দেশের উন্নয়নের সাথে সাথে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। https://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_good.gif

    GD Star Rating
    loading...