বড় গল্পঃ বন্ধ দুয়ারের ওপাশে

2691

(১)
তাদের সে সময়টা ছিল আবেগ আর ভালোবাসায় ভরা। মিলা আর জাহিদ তারা দুজনেই একে অন্যের প্রতি ছিল দারুণ অনুরক্ত। একে অন্যকে এক মুহুর্ত না দেখে, কথা না বলে থাকতে পারতো না কিছুতেই। নব যৌবনকালের উতলা সে সময়। সর্বদাই একে অন্যের প্রতি চুম্বকের আকর্ষণ যেন অনুভবে। বুক আনচান অকারণ অস্থিরতা, কোন কাজে মন না বসা সহ ভিত্তিহীন নানা কাল্পনিক উদ্বেগের হাস্যকর ছটফটানি। তারপর দেখা হবার মুহুর্তে যেন পরম প্রাপ্তি পরম তৃপ্তি। এমন উথাল পাথাল প্রেম অথচ আশপাশের কেউ জানবে না বা কারো চোখে পড়বে না তা কি কখনও হয় না হয়েছে!!

জাহিদ ও মিলার প্রেমের কথা চারদিকে রাষ্ট্র হতে দেরি হয়নি। যেদিন প্রথম মিলার বাসায় নালিশ গেল সেদিন থেকে তার বাসায় শুরু হলো নানা অশান্তি। কৈফিয়তের পর কৈফিয়ত। মিলার চলাচল, জীবনযাপন, পড়াশোনায় নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলো স্বাভাবিকভাবেই। এমনকি বিয়ের জন্য পাত্র দেখাদেখিও চলতে লাগলো। এর মুল কারণ তখনকার সামাজিক প্রেক্ষাপট ও তৎকালীন সমাজে নারীদের অবস্থান। অন্যদিকে মিলার পরিবারের দিক থেকে এতোটা কঠোর হবার কারণ মিলা ছিল নামকরা তথাকথিত উচ্চ বংশের অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়ে আর জাহিদ ছিল ভারত ফেরত শরনার্থী পরিবার। তাদের না ছিল চাল না ছিল চুলো। তার বাবা কাজ করতো একটা প্রাইভেট ব্যাংকে। থাকতো দুই কামরার ভাড়া বাড়িতে। সংসারে অশান্তি টানাটানি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। তবে হ্যাঁ সাংসারিক নানা অভাব অনটন স্বত্ত্বেও লেখাপড়ায় ভালো হওয়াতে বাড়ি থেকে পড়াশোনার সাপোর্ট জাহিদ পেয়েছে বরাবরই আর সেই সাথে টিউশনি করে নিজের খরচ নিজে চালাবার যোগ্যতা তার ছিল। স্বাভাবিকভাবে নানা কারণে তাকে নিয়ে অনেক আশা ছিল তার বাবা মায়ের। আর সে কারণে ছেলের প্রেম সংক্রান্ত গুঞ্জনে তারা বিরক্ত হলো যদি দুই পরিবারের অমতের কারণ ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। কিন্তু এক জায়গায় তারা একমত ছিল এ সম্পর্ক কখনও পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না।

কিন্তু দুরন্ত কিশোর কিশোরী দুজন কোন বাঁধাই বাঁধা মনে করলো না। তারা খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলো সব প্রতিকুলতাকে তারা দুর করে তারা মিলিত হবে। এবং নব প্রত্যয়ে তারা এক নিশুতি রাতে বাড়ি ছাড়লো। তখন জাহিদ সবে অনার্স শেষ করেছে আর নিলা ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী স্থানীয় কলেজের। তারপরের জীবন কঠিন সংগ্রামের। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে জাহিদের পরিবার বিয়েটা মেনে নিলেও বলা যায় ছেলের জিদের কাছে পরাজিত হয়ে এই বিয়ে মেনে নিতে বাধ্য হলেও মিলার পরিবার। মিথ্যা অহংবোধের বশবর্তী হয়ে মিলাকে মেনে নিলেও জাহিদকে তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না। এ নিয়ে জাহিদের পরিবারের লোকজন স্বভাবতই মিলার প্রতি অসন্তুষ্ট রইলো যদিও মিলার এক্ষেত্রে কোন হাতই ছিল না। জাহিদ ততদিনে অনেক ভালো চাকরি পেয়ে গেছে এবং প্রতি বছর তার উত্তরোত্তর উন্নতিও ঈর্ষণীয়।

সব মিলিয়ে জাহিদ আর মিলা ভালো আছে। তারা চুটিয়ে ঘরসংসার সামলাচ্ছে। জাহিদের বাবা গত হওয়ার পর থেকে তার মায়ের মধ্যে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন এলো একাকিত্ব আর বংশ রক্ষার তাগিদে সখিনা বেগম মাঝে মাঝে ফুট কাটলে লাগলো ছেলের কাছে ঘরে কোন সন্তান আজ অবধি হলো না বলে। তলে তলে তিনি ছেলেকে আর একটা বিয়ে করার জন্য প্রায় প্ররোচিত করতে লাগলেন। মিলার দৃষ্টিতে সবই পড়ে তবে মায়ের কথায় জাহিদ কোন পাত্তা দেয় না বলে সে আর এ নিয়ে মাথা ঘামায় না। সত্যি বলতে কি তার স্বভাবে ঝগড়া ফ্যাসাদ রাগ বিরাগ তেমন একটা নেই। নিতান্ত ভালো মেয়ে বা বউ এর আর্দশ উদাহরণ বলা চলে তাকে।

(২)
এভাবে কেটে গেল সাত সাতটি বছর। দীর্ঘ সময়। আজ মিলার সারাটা দিন মহা ব্যস্ততা কাটলো তবে এই সব ব্যস্ততাকে তার একটুও ব্যস্ততা মনে হয়নি পুরো সময় যে কোথা থেকে কেটে গেছে সে টেরই পায়নি। জাহিদের পছন্দের সব রকমের খাবার নিজ হাতে যত্ন করে রান্না করেছে আজ। বেশি করে কিসমিস আর কাজুবাদাম দিয়ে প্লেন পোলাউ, মাংসের টিকিয়া, খাসির কষা মাংস, ইলিশ পাতুরি, চিংড়ি মাছের মালাইকারি, মুগডাল আর কাতলা মাছ দিয়ে রান্না করেছে স্পেশাল মুড়ি ঘন্ট। সাথে একটু ঘন দুধের পায়েসও রেঁধেছে বেশি করে কিসমিস দিয়ে, এক হাতে সব করতে হয়েছে তাকে শ্বাশুড়ী গেছে ছোট মেয়ের বাড়ি,কাজের সাহায্যকারি মেয়েটিও আজ আসেনি। সব শেষে কেক বানাতে বানাতে বিকালটা পার হয়ে গেল কিভাবে কিভাবে। সন্ধ্যার আগে সেই কেক ওভেন থেকে বের করে চমৎকার ডেকোরেশন করলো মনোযোগ দিয়ে। কেকের পাশে সাজিয়ে রাখলো সাতটা মোমবাতি। আজ তাদের সপ্তম বিবাহ বার্ষিকী। সেই উপলক্ষে জাহিদ এলে কেক কাটা হবে। কোনবারই জাহিদ বিবাহ বার্ষিক বা মিলার জন্ম দিনের কথা ভোলে না, এসব ব্যপারে বেশ কেয়ারিং সে। কিন্তু কেন কারণে এবার তার মনে নেই। সারাজীবন তো একরকম যায় না বয়স বাড়ছে তাই হয়তো আবেগও কমে আসছে মিলা ভাবলো। এতো আয়োজনের অবশ্য আরও একটা কারণ আছে…

এত বছরের বিবাহিত জীবনে টুকটাক খুনসুটি ছাড়া তাদের মধ্যে বড় ধরনের কোন ঝগড়া পর্যন্ত হয়নি। শুনলে অনেকেই অবাক হশ। শুধু একটাই আফসোস রয়ে গেছে এতদিনেও একটা সন্তান হলো না। রাত বেড়ে যাচ্ছে। মিলা ফ্রেশ হয়ে নিজেকে চমৎকার সাজে সাজিয়ে নিল। সে নিজেও চাইছে জাহিদ আজ একটু দেরিতে ফিরুক এই ফাঁকে সে একটু সাজগোছ করবে। বরাবরই সে সাজতে ও সাজাতে পছন্দ করে। আচ্ছা জাহিদের বাসায় ফিরতে এত দেরি হচ্ছে কেন হঠাৎ মনে হলো তার। অফিসে কি আজ অনেক বেশি কাজ পড়েছে একবারও তো খোঁজ নিল না। এমনটাতো কোনদিন হয় না। কি আশ্চর্য কাজের ভীড়ে এতক্ষণ মাথায় আসেনি অন্য কথা ! বিপদ হয়নি তো কোন? জাহিদও একবার ফোন দেয়নি। সেও কাজের চাপে ফোন দিতে ভুলে গেছে। কি করে এমন ভুল হলো নিজের উপরই রাগ হলো মিলার। তারপর আয়নায় চোখ যেতে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হলো সে।

আচ্ছা জাহিদ কি তাকে দেখে চমকে যাবে যা বেহায়া পাগলামি নিশ্চয় করবে কিছু। মিলা লজ্জা পেল। বেশি রোমান্টিকতা হয়ে যাচ্ছে না হয় হোক সে তো আর বুড়ো হয়ে যায়নি। তারপরও জাহিদের খোঁজ নেই। না আর দেরি করা ঠিক হবে না। মোবাইলে দ্রুত কল দিল সে,তবে লাভ হলো না। সুইচ অফ বলছে। ঠিক সেই মুহুর্তে কলিং বেল বেজে উঠলে শরীরে যেন প্রাণ ফিরে এল তার। মিলা এক ছুটে দরজা খুলল। দরজা খুলতেই অচেনা একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুটা বিরক্ত হলো সে, কে এই মেয়ে বিরক্ত নিয়ে প্রশ্ন করলো সে
– কাকে চাই
মেয়েটি কোন উত্তর দিল না একটু হাসবার চেষ্টা করলো।
সিড়িতে আবার একটা পদশব্দ…
মেয়েটির পেছন থেকে জাহিদ বেরিয়ে এসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলল,
-অনিকা সম্পর্কে উনি তোমার বড় আপা হয়।উনাকে সালাম কর।
তারপর মিলির উদ্দেশ্যে বলল,
– মিলি, ও অনিকা। আজ থেকে আমাদের সাথে ও এই বাড়িতেই থাকবে! আমাদের বাড়ির নতুন সদস্য ও।
অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকালো মিলা। জাহিদ বিয়ে করেছে !!! মেয়েটি জাহিদের বিয়ে করা বউ!!

জাহিদের কথা গুলো যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসছে, জাহিদ যেন আর তার সামনে নেই। মিলা যেন আস্তে আস্তে হঠাৎ কোন অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। তার মাথা ঘুরছে, দুলছে পৃথিবী। অনেক আগেই কানাঘুষা শুনেছে সে। জাহিদ কোন একটা মেয়ের সাথে সময় কাটায় নানা হোটেল রেস্তোরাঁয়। বিশ্বাস করেনি সে, পাত্তাই দেয়নি কোন জাহিদের কাছে শোনা তো দুরের কথা। অন্ধ বিশ্বাসের এই পরিণতি হবে সে কোনদিন স্বপ্নেও ভাবেনি সে। নিঃসন্তান জীবনের একমাত্র সহায় জাহিদ অথচ.. বিশ্বাসের মূল্য এই্। অথচ সব চাওয়া পাওয়ার পূর্ণতার দ্বার প্রান্তে তাদের সম্পর্ক। কিন্তু আজ এ কেন সমীকরণে এসে দাঁড়ালো। এমন দিন তাকে দেখতে হবে সে কখনও ভাবতে পারেনি। সব বিশ্বাস ভেঙে গেছে তার। অনিকা নামের এই বাচ্চা মেয়েটি তার সতীন তবে কি শুধুমাত্র একটা সন্তান লাভের আকাঙ্খাই এত দিনের সম্পর্ককে ভেঙে গুড়িয়ে দিল এক নিমেষেই …
অথচ..।

(৩)
বহু বছর বাদে মিলার এই ফিরে আসাকে মিলার বাসার লোকজন কেউই সহজভাবে নিলো না। আসলে তাদের জীবনে মিলার আর কোন গুরুত্ব নেই। চরম অহংকারী পরিবারটির কাছে আজ মিলা মৃত। কেউ তার সাথে কথা বলে না, খেতে ডাকে না কোন প্রয়োজনীয় কথাও বলে না। যে বাবা তাকে এত ভালোবাসতো সেই বাবা একদিন কয়েকটা প্রশ্ন করার পর জানতে চাইলো সে ওই বাড়িতে কবে ফিরে যাচ্ছে।

মিলার মা মারা গেছে বছর পাঁচেক আগে এবং তার বাবা আবার বিয়ে করেছে। স্বাভাবিকভাবে পরিবারের কোন কিছু মিলার অনুকূলে আর নেই। খুব তাড়াতাড়ি মিলা তার বাবার বাড়ির সাথে তার সম্পর্কের ফাটলটা স্পষ্টত বুঝতে পারলো। যেখানে ভালোবাসা নেই সেখানে বাস করা যে অতি কষ্টকর। আবারও মিলা বাড়ি ছাড়া হলো। তবে এবার একা!
একদিন সকালে সবাই খেয়াল করলো মিলা বাসা ছেড়ে কোথায় যেন চলে গেছে। গুরুত্বহীন মানুষের বিদেয় হলে স্বার্থপরতার সংসারে সবাই দম ফেলে বাঁচে। মিলার ব্যপারে কোন খোঁজ নেবার প্রয়োজন টুকু বোধ করলো না কেউ।
অবহেলা অনাদর কখনও কখনও বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। মনে অনেক অনেক ব্যথা নিয়ে মিলা হারিয়ে গেল জন অরণ্যে।

(৪)
কোম্পানির মালিক রহমান সাহেবের অফিস কক্ষে দাঁড়িয়ে আছে রেজওয়ান। ডাক পেয়ে অনেকক্ষণ হয়ে গেছে সে এখানে এসেছে। কাজ পাগল রহমান সাহেব নিজের কাজ নিয়ে অতি ব্যস্ত রেজওয়ানের দিকে তার কোন খেয়াল নেই। ঢোকার মুখে শুধু একবার চোখ তুলে তাকিয়েছিলেন মাত্র। ব্যস ওইটুকুই। রেজওয়ান বুঝতে পারছে না তাকে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। চেয়ার টেনে বসার সাহস তার নেই কারণ সে সামান্য কর্মচারী। পা ব্যথা শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে চেয়ার টেনে বসলে কি খুব অন্যায় হয়ে যাবে হঠাৎ নিজের ল্যাপটপটা শাট ডাউন করে রহমান সাহেব রেজওয়ানের উদ্দেশ্যে বললেন।
– কি আশ্চর্য এখনও দাড়িয়ে আছো কেন বসো! বসো!! আমার সাথে তোমার মনে হয় এই প্রথম সাক্ষাৎ আসলে আমি গত দু মাস বাইরে ছিলাম, নিজের ব্যক্তিগত কিছু কাজে। তারপর ফিরে অফিসের পেন্ডিং কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তোমার সাথে সাক্ষাৎ করার সময় হয়নি। তবে তোমার কাজের বেশ প্রশংসা শুনেছি। তো বলো নতুন চাকরি নতুন পরিবেশ কেমন লাগছে রেজওয়ান
– জ্বি স্যার ভালো লাগছে।
– কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো!
– জ্বি না স্যার।
– কোন কাজ না বুঝতে পারলে অয়নের কাছ থেকে বুঝে নেবে। ওকে তোমার কথা বলা আছে।
– জ্বি স্যার, আচ্ছা।
– ও হ্যাঁ বসো বসো, এখনও দাঁড়িয়ে কেন
রেজওয়ান চেয়ার টেনে বসলো।
– দুপুরের খাওয়া কি হয়ে গেছে
– জ্বি স্যার খেয়েছি।
– কি দিয়ে খেলে, মাইন্ড করো না আবার, আমার খাওয়া দাওয়ায় গল্প করতে বেশ ভালো লাগে। হে হে হে…

মনে হচ্ছে রহমান সাহেব বেশ দিল খোলা মানুষ। কিন্তু প্রশ্ন শুনে রেজওয়ানের একটু অস্বস্তি লাগলো। সে যা খেয়েছে সেটা বলার মত কিছু নয়, মিথ্যা বলতে ইচ্ছে করছে না। অকারণ মিথ্যা বলা তার পছন্দও নয়। রহমান সাহেব রেজওয়ানের দিকে তাকিয়ে কি একটু ভাবলেন। তিনি লোক চরিয়ে খান ছেলেটাকে আপাতদৃষ্টিতে অন্য রকম মনে হচ্ছে। ভীষণ রকম চুপচাপ,শান্ত প্রকৃতির বোঝা যাচ্ছে। তাছাড়া তিনি খোঁজ খবর নিয়ে শুনেছেন কাজ ছাড়া বাড়তি কথা খুব একটা বলে না রেজওয়ান। এই বয়সের ছেলেরা স্বভাবে উচ্ছল চঞ্চল হয়। এই ছেলেটা বেশ ব্যতিক্রম। এর ভালো মন্দ দুটো দিক হতে পারে। সময়ই বলে দেবে।
– কথা বলছো না কেন রেজওয়ান, আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি তোমাকে। বললেন রহমান সাহেব।
-রুটি আর আলু ভর্তা।
রেজওয়ানের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন রহমান সাহেব, বুকের মধ্যে কেমন যেন হাহাকার করে উঠলো। ছেলেটির আর্থিক অবস্থা মনে হয় ভালো নয়। আহারে! না হলে দুপুরবেলা কেউ রুটি আলুভর্তা খায়!
– স্যার আমি কি এখন যেতে পারি
– তুমি কোথায় থাকো
– শ্যামলীতে।
– বাসায় তোমার কে কে আছেন
– আমি একা থাকি স্যার। এ পৃথিবীতে আমার কেউ নেই।
অদ্ভুত তো! কেমন যেন মায়া হলো তাঁর।
তিনি নিজেও এখনও দুপুরের খাওয়া খান নি। রেজওয়ানকে কি তিনি খেতে বলবেন বাসা থেকে খাবার পাঠিয়েছে। ভাত সাথে আট নয় পদের তরকারি। রহমান সাহেব ইতস্তত বোধ করলেন। ছেলেটি যদি বিব্রত হয়। কাউকে বিব্রত করার কোন অধিকার তার নেই অবশ্য। সে যেমনই অর্থনৈতিক অবস্থার অধিকারী হোক না কেন।
রহমান সাহেব বললেন
-আচ্ছা তুমি এখন যাও। পরে প্রয়োজনে তোমাকে ডেকে নেব।
রেজওয়ান নিঃশব্দে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।


ঘর খুলে বিথি দক্ষতার সাথে খুব দ্রুত হাতে ঘর গোছগাছ করলো। গোছগাছ করতে করতে মনে মনে ভাবলো এত অগোছালো কি করে হয় মানুষ! সাথে করে বেশ কিছু বাজার সদাইও এনেছে সে। ঘর গোছগাছের পরে প্রথমে মুরগী কেটে, কাটা মসলা দিয়ে রান্না বসালো সে। মুরগীর কষা ঝাল মাংস রান্না হবে এখন। এদিকে রেজওয়ান অফিস থেকে এখনও ফেরেনি। তাতে অবশ্য বীথীর ঘরে ঢুকতে কোন সমস্যা হয়নি। তার কাছে এই এক কামরার ডুবলিকেট চাবি সবসময়ই থাকে। রেজওয়ানের ফিরতে আজ দেরি হচ্ছে কেন কে জানে আজ দেরি হলে অবশ্য সমস্যা নেই বিথি বরং চাইছে রেজওয়ান দেরি করেই ফিরুক। এই ফাঁকে সে রান্না শেষ করবে। সে আজকের আইটেম মাংস, বেগুনভাজি চিংড়ি মাছের দোপেয়াজা, প্লেন পোলাও আর টক মিষ্টি দই।

অন্যের বাসায় এসে রান্না করার ব্যপক ঝামেলা। কোন জিনিস ঠিক মত পাওয়া যায় না। আর রেজওয়ান তো চুড়ান্ত অগোছালো। কোন জিনিস হাতের নাগালে নেই। এই রান্নার উদ্দেশ্য কি উদ্দেশ্য তো অবশ্যই আছে। আজ বিথি চাকরি জীবনে প্রথম বেতন পেয়েছে। বিথি যে চাকরি করছে সেটা সে রেজওয়ানকে জানানো হয়নি এ কদিনে। আজ জানাবে। ঘটা করেই জানাবে। সে জন্যই এই আয়োজন।
প্রথমে খাওয়া দাওয়া হবে তারপর রেজওয়ানের হাতে একটা মিষ্টি পান ধরিয়ে খুশির খবরটা দেবে বিথী। তারপর যত দ্রুত সম্ভব বিয়ের আয়োজন নিয়ে আলোচনা হবে। দীর্ঘ প্রেমের সফল সমাপ্তি হবে। আহ! ভাবতেই শরীরের মধ্যে রোমাঞ্চ হচ্ছে।
তারপর আগামীকালের কেনাকাটা আর নতুন বাসা খোঁজাখুঁজির ব্যাপারে আলোচনা করবে। মদপ্য বাবার হাত থেকে মুক্তির আনন্দে বিথীর মন আজ ভীষণ চঞ্চল। মনের মধ্যে জমা কষ্টের মেঘগুলো কেটে যাচ্ছে। আহ! মুক্তি!!!
রেজওয়ান আর সে। তাদের দুজনের আয়ে ভালোভাবে সংসার চলে যাবে। সুখেই কাটবে দিন।

সমস্ত কাজ গুছিয়ে বিথি গোসল সেরে নিলো। গোসল করার আগে সে একটু দ্বিধা করছিল। এর আগে সে কোনদিন রেজওয়ানের বাসায় গোসল করেনি। বাড়িতে অশান্তি বলে রেজওয়ান তাকে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে রেখেছে। তার অবর্তমানে যেন সময় সুযোগ মত বিথি এসে এখানে বিশ্রাম নেয় তবে গোসল টোসল সে বরাবরই এড়িয়ে গেছে অন্য কোন কারণে। রাত বাড়ে বিথি অপেক্ষা করে। অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় না।রেজওয়ান ফেরে না। ফোনও ধরে না। বিথি এক বুক অভিমান নিয়ে অপেক্ষা করে করে শেষ রাতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু কোথায় গেল রেজওয়ান!!

৫)
হঠাৎ কাকের কর্কশ ডাকে ঘুম ভাঙলো বীথির। রাত এখনও পোহায়নি। রেজওয়ানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে সে নিজেই জানে না। ঘুম ভেঙে প্রথমে সে মনেই করতে পারলো না ঠিক কোথায় আছে। তারপর আস্তে আস্তে সব মনে পড়তেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। সে তো রেজওয়ানের বাসায় কিন্তু রেজওয়ান তো এখনও ফেরেনি। কোন বিপদ হয়নি তো গতরাতে অজস্রবার ফোন দিয়েও ফোন বন্ধ বলে কল ঢোকেনি। রেজওয়ানের ফোনের চার্জ ফুরিয়ে যেতে পারে এটাই ভেবেছে সে কিন্তু… । জসীমের ফোনে ফোন দিয়ে জানলো জসীম এখন গ্রামের বাড়িতে, তার মায়ের শরীর খারাপ। গত দুদিন রেজওয়ানের সাথে তার যোগাযোগ হয়নি। জসীম রেজওয়ানের একমাত্র বন্ধু, জানতে চাইলো অনেক কিছু কিন্তু পরে কথা বলবে বলে এড়িয়ে গেল বিথী। তার ভীষণ খারাপ লাগছে, কেন জানি কান্না পাচ্ছে। অফিসে বা অফিসের কারো কাছে ফোন দিলে কেমন হয়। তবে এত সকালে খোঁজ নেওয়া যাবে না অপেক্ষা করতে হবে কিন্তু অফিসের কারও ফোন নাম্বারও তো বিথীর কাছে নেই। রেজওয়ান বরাবরই ফোনের সংক্রান্ত ব্যাপারে বেশ উদাসীন। তার উপর ইদানীং ওর ফোনে ব্যাটারীটা ঝামেলা করছে। চার্জ দিলেও চার্জ দাঁড়াচ্ছে না। সেই কারণে হয়তো যোগাযোগ…. তাই বলে রাত ভোর হয়ে যাবে তবু বাসায় ফিরবে না। ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিতে দিতে আযানের ধ্বনি কানে ভেসে এলো বিথীর। হাত মুখ মুছে মোবাইল চেক করে দেখলো বীথির বাবা ওসমান আলী ফোন দিয়েছে বেশ কয়েকবার। বিয়াল্লিশটা মিস কল। বীথি তাচ্ছিল্যের সাথে ঠোঁট উল্টালো, কল ব্যাক করার কোন ইচ্ছে আপাতত নেই তার। মদপ্য জুয়াড়ি বাপের প্রতি সে কোন টান অনুভব করে না। শুধুমাত্র জন্মদাতা পিতা বলে তার সাথে কোন খারাপ ব্যবহার করতে পারে না।

কল লিস্টে অন্য একটা আননোন নাম্বার থেকে পনেরটা মিসকল এসেছে ! বিথীর ভ্রু কুঁচকে এলো..
রেজওয়ান কি কিন্তু… কল ব্যাক করার আগে।
মেসেজ চেক করে দেখলো। নতুন মেসেজ এসেছে সেই আননোন নাম্বার থেকেই।
বীথি তুমি যত দ্রুত সম্ভব ইবনেসিনা হাসপাতালে চলে আসো।
~রেজওয়ান
মেসেজটা কিছুক্ষণ আগে সেন্ড করা হয়েছে। এর মানে কি…. হঠাৎ রেজওয়ান অসুস্থ হবে কেন। সারা রাত ও কোথায় ছিল হাজারটা প্রশ্ন। এটা কোন ফাঁদ নয় তো। কত কিছু তো আজকাল ঘটে এ শহরে………

৬)
রহমান সাহেবের মেজাজ খারাপ হয়ে আছে, খুব খারাপ। তাঁর সামনে যে পড়ছে তার সাথেই তিনি খারাপ ব্যবহার করছেন। এই ধরনের আচরণ তার স্বভাবের সাথে যায় না। সবাই তাকে সদালাপী আর মিষ্টভাষী বলেই জানে আর তাই সকলেই কম বেশি যথেষ্ট বিস্মিত। অবশেষে কারণ জানা গেল, কারণ সামান্যই তবু তিনি এতটা অস্থির হয়ে আছেন। কি এমন কাহিনী সেটাই কেউ বুঝতে পারছে না।
রেজওয়ান হঠাৎই অনুপস্থিত তার হদিস ক’দিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না বা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ নিরুদ্দেশ বা লাপাত্তা যাকে বলে ঠিক তাই। এখনকার সময়ে জলজ্যান্ত মানুষ হুট করে উধাও হয়ে যাবে এটা কিভাবে সম্ভব। কোন না কোন ট্রেস তো থাকবে অথচ কোন রকমেই কোন ট্রেস পাওয়া যাচ্ছে না। কি অদ্ভুত! কেন সে নিরুদ্দেশ কেন সে অফিসে আসছে না কেউ কিছুই বলতে পারছে না। রেজওয়ানের ফোন বন্ধ। বাসার ঠিকানাও কেউ জানে না। এটা কিভাবে সম্ভব।
অদ্ভুত!
অফিসে যে ঠিকানা দেয়া সেই ঠিকানায় গিয়ে তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। সে নাকি বাসা বদলেছে কদিন আগে। তার মানে লোকটি সত্যি সত্যি নাই হয়ে গেছে। কিন্তু রহমান সাহেব সে-সব কিছু মানতেই চাইলেন না তার যে কোন মূল্যে রেজওয়ানকে চায়।
সময় গড়িয়ে আজ বারো দিন হলো সে অফিসে আসেনি। এই দুই মাসে এত ভালো,সহজ সরল একটা ছেলের সাথে কারোই ভালো সম্পর্ক হয়নি কি আশ্চর্য!
পনেরোতম দিনে রহমান সাহেব রেজওয়ানের বায়োডাটা আনতে বললেন অয়নকে। এবার তিনি স্থানীয় ঠিকানায় খোঁজ খবর নিবেন। যথা সময়ে স্থায়ী ঠিকানায় পৌঁছে খোঁজ খবর নিয়েও স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন। কে এই রেজওয়ান
————————
বিথী বসে আছে রহমান সাহেবের সামনে। এই কদিনে তার চেহারায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। তার চোখের নিচে কালি। সজল চোখ। চুলগুলোও সে ঠিক মত বাঁধেনি। পোষাকটাও মলিন। পুরো চোখে মুখে অসম্ভব এক কষ্টের ছাপ।
– তোমার নাম
– বিথী। কামরুন্নাহার বিথী।
– বলো কি বলতে চাও
– আসলে আমি এসেছি একটা খবর জানাতে।
– খবর কি খবর
– আপনার এখানে কাজ করতো। রেজওয়ান নাম ছিল।
– হু বল.. বল তারপর হ্যাঁ হ্যাঁ রেজওয়ান কোথায় ও কোথায় আছে এখন
– গত সপ্তাহে সন্ধ্যার সময় ওর একটা এক্সিডেন্ট হয়। মারাত্মক এক্সিডেন্ট
– এক্সিডেন্ট!
– হ্যাঁ
-তারপর…..
– যমে মানুষে লড়াই চলল টানা বারো দিন। অবস্থা ক্রমশ খারাপ হলো এবং তেরোতম দিনে রেজওয়ান মারা গেল।
– তুমি আমাদের সাথে একটু যোগাযোগ করতে পারতে
– আসলে আমার কাছে ফোন নাম্বার ছিল না। আর সবে মাত্র জয়েন্ট করা একজন সাধারণ কর্মচারীর দায়ভার কোন কোম্পানি কি নেয় বলুন। আমি সেই ভাবনা থেকে
-তাই বলে অফিসের নাম তো জানতে নাকি অফিসে যোগাযোগ করবে না
– আমার মাথায় অত কিছু আসেনি স্যার। আমি আসলে একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। কোন সহায় পাচ্ছিলাম না। কি করবো কোথায় যাবো টাকা কেথায় পাবো… আমরা দরিদ্র শ্রেনির মানুষ কে করবে সাহায্য কেউ করেনি। গত পরশু ও মারা গেছে। বলেই হু হু করে কেঁদে উঠলো বিথী। রহমান সাহেবও কাঁদছেন।

– ওহ! রেজওয়ান। আমার রেজওয়ান! বলে সবাইকে অবাক করে দিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন।
বিথী কাঁদছিল হঠাৎ রহমান সাহেব আর্তনাদ শুনে সে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। সেই চোখে হাজার প্রশ্ন।
অনেকটা পরে ধাতস্থ হয়ে জাহিদুর রহমান বললেন,
– রেজওয়ান আমার ছেলে ছিল। ওর মা মিলা ছিল আমার হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী। আমার ভুল আর গোয়ার্তুমির কারণে মিলা হারিয়ে গিয়েছিল। আমি রেজওয়ানের বায়োডাটা ঘেটে ওর স্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে সব খোঁজ খবর নিয়ে নিশ্চিত হয়েছি। ব্যপারটা আমার জন্য কতটা আনন্দের ছিল সে শুধু আমিই জানি তার মধ্যে ও নিখোঁজ হল। আহ! নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস। জানো মেয়ে আমার স্ত্রী মিলা অনেক অভিমানী ছিল। ও আমাকে সবচেয়ে বেশি বুঝতো, খুব ভালোবাসতো। আমারই ভুলে আমার একমাত্র বংশধর মায়ের মত এক বুক অভিমান নিয়ে চিরকালের মত হারিয়ে গেল। ওহ! আমার প্রাণ প্রিয় স্ত্রী মিলা। আমার প্রিয় রেজওয়ান চিরজনমের মত হারিয়ে গেল !!
বিথী অবাক হয়ে তখন তাকিয়ে আছে। কাঁদতেও ভুলে গেছে সে।এ কি করে সম্ভব …

”আমি সাগরের বেলা, তুমি দুরন্ত ঢেউ
বারে বারে শুধু আঘাত করিয়া যাও
ধরা দেবে বলে আশা করে রই
তবু ধরা নাহি দাও
জানি না তোমার একি অকরুণ খেলা
তব প্রেমে কেন মিশে রয় অবহেলা
পাওয়ার বাহিরে চলে গিয়ে কেন আমারে কাঁদাতে চাও
বুঝি আমার মালায় মায়ার বাঁধন নাই
আপনজনেরে আপন করিয়া বাঁধিতে পারিনা তাই
আসে আর যায় কত চৈতালি বেলা
এ জীবনে শুধু মালা গেঁথে ছিঁড়ে ফেলা
কোন সে বিরহী কাঁদে মোর বুকে তুমি কি শুনিতে পাও
—————-
গীতিকারঃ প্রণব রায়
শিল্পী ও সুরকার – মান্না দে “
সমাপ্ত

© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক

GD Star Rating
loading...
GD Star Rating
loading...
বড় গল্পঃ বন্ধ দুয়ারের ওপাশে, 5.0 out of 5 based on 1 rating
এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের,লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

২ টি মন্তব্য (লেখকের ১টি) | ১ জন মন্তব্যকারী

  1. মুরুব্বী : ০৫-০১-২০২২ | ১৩:২১ |

    “এ জীবনে শুধু মালা গেঁথে ছিঁড়ে ফেলা
    কোন সে বিরহী কাঁদে মোর বুকে তুমি কি শুনিতে পাও”

    মিলা আর জাহিদ এবং রহমান সাহেব সহ বিথী …

    অসাধারণ উঠে এসেছে বড় গল্পটি। চমৎকার কিন্তু অনভিপ্রেত সমাপ্তি। গুড।https://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_good.gif

    GD Star Rating
    loading...

মন্তব্য করুন