3993

প্রিয় আম্মা,
কেমন আছেন আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে। মোবাইলটা হাতে থাকলে ফোন করতে পারতাম কিন্তু হাসপাতাল এর নিয়ম সকাল এবং বিকাল এই দুই সময় মোবাইল রোগীকে দেওয়ার, শৃঙ্খলিত জীবনের এইটিই নিয়ম। একটু একটু কাশি আর জ্বর নিয়ে বাসা ছেড়ে আসলাম আজ ১৫ দিন, প্রথম প্রথম চলার শক্তি ছিলো, মনেরও শক্তি ছিলো এখন কাশি আর জ্বর বাড়ার সাথে সাথে চলার শক্তি আর কথা বলার শক্তিও লোপ পাচ্ছে। নার্স ও ডাক্তার নিয়ম করে আসে দেখে ঔষধ দেয় তা খেয়ে আমি যেন আরো কবরের কাছাকাছি যাচ্ছি। কী যেন এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে মাটির নিচে বন্ধ ঘরে আদর করে ডাকছে। সাদা সাদা পোশাকের চোখ মুখ বন্ধ করা ডাক্তার নার্সকে সেই কবরের দূত মনে হয়। তখন আরো বেশী মনে পড়ে মায়ের মুখ, কচি কচি দুই ছেলে আর আপনার বউমার নিষ্পাপ মুখটা। আমি শিশুকালে পিতৃহীন হয়েছি এখন মনে হয় আমার দুই ছেলেও তাই হবে। এগার বছর আগে ঘর ছেড়ে, দেশ ছেড়ে প্রবাসী হয়ে মুক্ত কারাগারে বন্দী হই।

দেশে যাবো যাবো বলেও কোনো এক অদৃশ্য পিছুটানে যেতে পারিনি। আপনি কী এখন বয়স্ক নারী দেখতে কেমন মা আপনার মুখটি, ছেলে দুইটাও বড় হয়েছে তাদের মা ভালোবাসার অপ্রাপ্তিতে বিরক্ত হতে হতে এখন কথাও বলা ছেড়েছে। মারে, কষ্টটা দিন দিন আরো যেন বাড়ছে সেই কষ্ট সহ্য হয় না মা, তাই মনে হয় শরীর হতে দম পাখি উঠে গেলেই বাঁচি। এইটি কেমন হাসপাতাল বুঝে আসে না মাছি মশা তো দূরের কথা এক জটলা হাওয়াও আসার পথ নাই, যেন এটা আরেক কবর দুনিয়ার উপর। এখন হতে আর কথা বলার সুযোগ হবে না, কী করে বলবো আমি তো শক্তিই পাচ্ছি না। আজ সকালে কষ্ট করে উঠে দাড়ালাম বড্ড ইচ্ছে করলো আকাশ দেখতে। সাদা পর্দা সরাতে গিয়ে আমার গায়ে জড়িয়ে যায় পর্দাটা, দেখলাম অবিকল একটা লাশ দাড়িয়ে আছে আলো বাতাস পাওয়া এই স্বার্থময় দুনিয়ায়।

আকাশে কোথাও একটু মেঘ নাই কোথাও একটা উড়ন্ত পাখি নাই জমাট বাঁধা বরফের মত শীতল পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে খুব মন চায় মা। এখন আমার দালান বাড়ি আছে, চাষ করার জমি আছে, বসে বসে খাওয়ার জন্য ব্যাংকে টাকা আছে। অথচ প্রবাস নামক এই যাযাবর জীবনে শেষ মুহূর্তে এসে করোনা নামক এক শক্তি বলছে চলো যাই মাটির ঘরে। মাগো মরণকে যদিও খুব ভয় লাগে তারপরও মরতে খুব ইচ্ছে করে তোমার কোলে। আমার এই রুমটায় এখনো কোন রোগী সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরতে দেখি নাই অথচ রোজ মরে দুই একজন। এই মরণ দেখে দেখে বুকটা ভেঙ্গে যায় ভয়ে, না জানি কখন আবার আমার ডাক আসে। “ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, রইবো না আর বেশী দিন তোদের মাজারে।” অতিদূরে রোগীটা আফ্রিকার কোন দেশের হবে হয়তো, রোজ কান্না করে বুক ভাসায় তার বুক-ফাটা কান্দনে আমিও কান্নায় চিৎকার করে তোমায় ডাকি মা-জননী ।

(প্রথম কিস্তি)
উৎসর্গঃ করোনায় মৃত প্রবাসী এনামকে।

VN:R_U [1.9.22_1171]
রেটিং করুন:
Rating: 5.0/5 (1 vote cast)
করোনায় আক্রান্ত প্রবাসী ছেলের মা‘কে চিঠি, 5.0 out of 5 based on 1 rating
FavoriteLoadingলেখা প্রিয়তে নিন

ফয়জুল মহী সম্পর্কে

হে পরমেশ্বর,এই নশ্বর নিখিল সৃষ্টিতে রেখো না ওই মানুষ যার ভিতর নরত্বের অভিনিবেশ নাই ।
এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের,লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর।
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে অণুগল্প, সমকালীন-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

৩ Responses to করোনায় আক্রান্ত প্রবাসী ছেলের মা‘কে চিঠি

  1. নিতাই বাবু বলেছেনঃ

    এভাবে হয়তো একদিন আরও অনেক অনেক প্রবাসীর কান্না বন্দীঘর থেকে বাতাসে ভেসে বেড়াবে। তখন হয়তো আরও লাখো প্রবাসীর মায়ের কান্নাকাটি আমরা শুনতে পাবো। কিন্তু তখন আমাদের হবে শুধুই শোনা। করার কিছুই থাকবে না। তাই বলছি, "প্রাবাসীদের কান্না কি কেউ শুনতে পাও?

     

    VN:R_U [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)
    • ফয়জুল মহী বলেছেনঃ

      মানুষ বাঁচার জন্য নিশ্বাসের সাথে অক্সিজেন নেয় কিন্তু তা মানুষের  প্রমাণ করা কঠিন। তেমনি প্রবাসীও পরিবারকে অক্সিজেন দেয় কিন্তু তা প্রমাণহীন । 

      VN:R_U [1.9.22_1171]
      Rating: 0 (from 0 votes)
  2. মুরুব্বী বলেছেনঃ

    চিঠিতে একজন প্রবাসীর যে আকুতি শব্দ কথায় ফুটে উঠেছে সত্যিকারার্থেই ভীষণ স্পর্শকাতর। মন কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। পৃথিবীর সবাই সবখানে ভালো থাকুক। Frown

    VN:R_U [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)

মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।