গুড়ের চা

এক
শীতকাল পুরোনো নীল সোয়েটারের শক্তিপরীক্ষা নেয়।
শুরুতে মনিদার ছিল, তারপর ছোড়দা পরতো, এখন চাঁদের গায়ে। ক্যাশমিলনের তৈরি, কিন্তু তাতে বিচ্ছেদের ভাগ বেশি; ক্ষার-কাচায় আর টান খেতে খেতে উলগুলোর ফেস্টো বের হয়ে গেছে, হাওয়া পাস করে মাছের-চোখ ডিজাইনের ভেতর দিয়ে।

লেপেরও তুলো সরে গেছে স্থানে স্থানে; মুড়ি দিলেও যখন চোখে আলো আসছে, বুঝতে হবে ভোর হল মশারি খোলো। ঘুম থেকে উঠেই চলো রান্নাঘর, রাতের বাসি উনুন থেকে ঘুঁটের ছাই অধিকার করি, দাঁত মাজি যতক্ষণ না হাতে-দাঁতে কিচকিচ আওয়াজ। কিন্তু বিছানা ছাড়ার আগে হি-হি করতে করতে ওই নীল সোয়েটার পরে নেওয়া, যে সব সময় সমকালীন শীত থেকে পিছিয়ে আছে। তার নীচে হাফ প্যান্ট, থাইয়ের লোমগুলো যেন কাঁটানটে গাছ। এই পৃথিবীতে পাঁচ বছর বয়েসে পাজামা পরার নিয়ম বা পয়সা নেই।

বাইরে এসে দাঁড়ালে নতুন দিনের দরজা খোলার খুটখুট কানে আসবে। সেই শব্দ উঠোনের শালিখদল, পতিত কিন্তু ঝলমলে আমড়াপাতা আর সমতল কুয়াশার পাহাড়ি হয়ে ওঠার স্বপ্ন দিয়ে তৈরি। রোদের রশ্মি এতক্ষণে পৃথিবীতে নামছে, তাকে রাস্তা চিনিয়ে আনছে গুলকয়লার ধোঁয়া। তবু এখনও আমগাছের পল্লবে মাকড়সার জাল বিয়ের কনের মুক্তোমুকুটের মতো নেহার ফোঁটায় সেজে আছে। আবার পেয়ারাকুঁড়ির গা-য় সাদা তুলো জমাট-বাঁধা, নখ দিয়ে খুঁটেছ কি নীচে হোমিওপ্যাথ দানার চেয়েও ছোট ছোট পতঙ্গের ডিম, টিপলে দুধ বেরিয়ে আসে। এসব দেখতে দেখতে রোদের ফালিগুলো বড় হল, পুব দিকের ডোবা পেরিয়ে চাকা নামাল চাঁদের উঠোনে। তখন হাতে বোনা এক একটা খেজুরপাতার পাটি ওই রোদের স্লাইসগুলোর ওপর পেতে বই নিয়ে বসে যায় ছেলেমেয়েরা, আর গ্যাঙোর গ্যাঙ শুরু চার-পাঁচটা নিনাদিত গলায়। কেউ নিজের পড়া শুনতে পাচ্ছে না-র মধ্যে চাঁদ শুধু নিশ্চুপ হয়ে থাকে। মা টের পায়।
— মন কোথায় তোর?
— আমার ক্ষিদে পায়ে গেছে।
— বাহ, ঘুম থেকে উঠতি না উঠতিই ক্ষিদে! পেটে কী ভস্মকীট বাসা করিছে?

সোয়েটারের ওপর দিদিমা তুষের চাদর পরিয়ে দিয়েছিল ঘাড়ে গিঁট বেঁধে, তার মধ্যে কিছু একটা নড়ে ওঠে। “আবার তুই বিড়েল নিয়ে বসিছিস? এই তোর পড়াশুনো? দেখিসকানে, কোনওদিন ইস্কুলে ভোত্তিই করবো না তোরে, সারা জীবন মুখ্যু হয়ে ঘরে ব’সে বিড়েল ঘাঁটিস”।

এই শাসানি গণপ্রহারের চেয়েও সাংঘাতিক; চাঁদ প্রাণীটিকে তড়িঘড়ি মুক্ত করে দেয় — একটা ফুটফুটে সাদাবাদামি শিশু, যে চাদরের ওম হারিয়ে অখুশি মুখে এক লাফে আবার চাঁদের কোলে উঠে আসছিল। তখন ঘাতকের মতো তার ঘেঁটি ধ’রে শূন্যে ছুঁড়ে দেয় চাঁদ, আকাশে তিনচার ডিগবাজি খেয়ে বেড়াল ক্যাঁক ক’রে পেট দিয়ে পড়ে শুকনো উঠোনে।

দুই
এই দৃশ্যের গায়েই লেগে আছে বাড়ির খেজুরগাছ বেয়ে মনিদার উঠে যাওয়া। ঝট ক’রে রান্নাঘর থেকে একটা অ্যানামেলের গেলাস হাতে নিয়ে সেও ছোড়দা আর বোনের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। মাটির ঠিলে গাছ থেকে নামিয়ে মায়ের শাড়ি-ছেঁড়ার ছাঁকনি দিয়ে মনিদা সবার গেলাসে কিছুটা করে প্রথম-কাটানের খেজুররস ঢেলে দিচ্ছে, ওমনি ছাঁকনি থেকে তিন চারটে কালো বোলতা ফড়ফড় ক’রে বাতাসে ওড়ে। নাক-জ্বালা-করা ঝাঁঝালো কিন্তু মিছরির মতো ঠান্ডা সেই রসে শিরদাঁড়ায় শীতের কাঁপুনি ফিরে আসে চাঁদের, লাফ দিয়ে খেজুরপাতার চাটাইয়ে উপনীত হয়। কিন্তু রোদে ব’সেও দাঁত-ঠকঠকি কমছে না কেন! পেছনে তাকিয়ে দ্যাখে ছোড়দা বেমালুম তার রোদ্দুর আড়াল ক’রে দাঁড়িয়ে! রাগে অন্ধ ছেলে “সর, শালা” ব’লে দাঁত-বের-করা দাদাটির দিকে ইঁটের টুকরো তোলে। ওমনি সে চেঁচিয়ে, “দ্যাখো মা, ভাই আমাকে শালা বলল”।

তাহলে কলোনির গাঙ্গুলিবাড়িতে খবরের কাগজ পৌঁছনোর আগেই দিনের প্রথম এফআইআর রুজু হয়ে গেল চাঁদের নামে। প্রতিদিন ছোট-বড় মিলিয়ে এরকম সাত-আটটা। বেলা যতই আকাশ বেয়ে ওঠে, তার নামের সঙ্গে অপহরণ, রাহাজানি, খুনের প্রচেষ্টার মতো অভিযোগ জড়িয়ে যায়; একটা টাটকা-ফ্রেশ সকাল শুধু চাঁদের অপকর্মের জন্যেই ক্রমে দুপুরবিকেল থেকে স’রে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সে অপরাধগুলো না করলে পৃথিবীতে… পৃথিবী না হোক, দত্তপুকুরে রাত নামত না কখনও। আর রাত্রি অনুৎপন্ন হলে কাজ থেকে ফিরে বাড়ির বড়রা কীভাবে আইন নিজেদের হাতে তুলে নেবে, আর কী ক’রে ভাইকে মার খাওয়ানোর আনন্দে খ্যা-খ্যা ক’রে হাসবে দাদা-দিদি?

তিন
তবে বিদ্যাভ্যাসে আকর্ষণীয় সব বাধা আছে। “দুউউউধ” ব’লে বড় রাস্তা থেকে একটা ফাটা গলা চিৎকার দিতেই তিন লাফে কলতলার পাঁচিলের ওপর রাখা বাটিটা হাতে তুলে নেয় চাঁদ। গোয়ালা হারানকাকুর দুধের ড্রামে খেজুরপাতা বসানো, সে মাসকাবারি যোগান হিসেবে এক ঘটি মানে আধ সের দুধ চাঁদের হাতে ধরা বোকনো বাটিতে ঢেলে দিল। তারপর তাদের টিউবয়েল থেকে ঝক-ঝক ক’রে জল ভ’রে নিল ক্যানে। এইভাবে চোখের সামনে দুর্নীতি দেখলে বাবা খুবই আপত্তি করেন। কিন্তু বাবা আর মা যথাক্রমে আদর্শ এবং তা থেকে দুশো মাইল দূরের বাস্তববাদ। মা-র পরিষ্কার কথা, জল তো ওরা মেশাবেই মেশাবে। পুকুরের পচা জলের বদলে বরং কলের ভালো জলই ঢালুক।

আসলে, ঘোষেরা কলকাতায় সাপ্লাই দেবে ব’লে ভেন্ডারে ক’রে দুধ নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিদিন তারা লেট, ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকে ব’সে থাকে, ছাড়ো-ছাড়ো ভাব, তখন রাস্তা দিয়ে বাঁক কাঁধে দৌড়োবে, মুখে এক প্রবল “ও ও ওয়, ও ও ও ও ওয়”। গার্ড সেই ফুসফুস-ফাটানো চিৎকারের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় ট্রেন, বদলে সে ফ্রিতে কিছুটা দুধ পেল কিনা সে প্রশ্ন অবান্তর। কিন্তু আজ স্টেশানে পৌঁছনোর আধ ঘন্টা পরেই দেখা গেল গোয়ালার ঝাঁক বাঁক কাঁধে মন্দ-মন্দ পায়ে আবার কলোনিমুখো। মছলন্দপুরে ট্রেন লাইনচ্যুত, এতক্ষণ কোলে মার্কেটে তাদের মহাজন ব’সে থাকবে না ব’লে অর্ধেক দামে গ্রামেই সব দুধ বেচে দেবে ঘোষ সম্প্রদায়। তখন দিদি স্কুলের যাওয়ার জন্যে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে “আর এক সের দুধ কেনো না মা, পায়েস খাবো!” অনুনয় রাখলে ঘরে চিনি বাড়ন্তের জন্যে মা কিন্তু-কিন্তু করেও শেষে আঁচলের গিঁট খুলে ফ্যালে। চাঁদ অবাক হয়ে দ্যাখে তাদেরই কলের জল দুধ হয়ে তাদেরই ঘরে ঢুকে গেল।

“ও মা, খাতি দেবা না?” ডাকে সেই ক্ষোভ মিশিয়ে দেয় সে, এবং সঙ্গে সঙ্গেই “আসে নিয়ে যাও” শুনে ভাইবোনদের দুমদাম দৌড় রান্নাঘরে। চাঁদ মুড়ির বাটি আর হাতলভাঙা কাপে চা সন্তর্পণে ধ’রে ফেরত আসে খেজুরপাটিতে। গুড়ের চায়ে প্রথম চুমুকেই প্রাণ জুড়িয়ে গেল, আহ কী মিষ্টি! এক মুঠো মুড়ি ফেলে দেয় চায়ের কাপে, তারপর কানের কাছে কাপ তুলে আনে। এখন কিছুক্ষণ সে খাওয়া ভুলে শোঁ-শোঁ সমুদ্রগর্জনে মোহিত হয়ে থাকবে।

(চলবে)

GD Star Rating
loading...
GD Star Rating
loading...
গুড়ের চা, 5.0 out of 5 based on 1 rating
এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের,লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

১টি মন্তব্য (লেখকের ০টি) | ১ জন মন্তব্যকারী

  1. মুরুব্বী : ২২-০৯-২০২২ | ১১:৩৪ |

    বেশ ভালো মানের লিখা উপহার পড়লাম। অসংখ্য শুবকামনা প্রিয় কবি চন্দন দা। https://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_Yes.gif.gif

    GD Star Rating
    loading...

মন্তব্য করুন