কালো মেয়ের পায়ের তলায় আলো (শেষ কিস্তি)

বরযাত্রীরা চলে গেলে পাড়া-প্রতিবেশিরা কেউ আকারে ইঙ্গিতে, প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে দুয়ো দিতে লাগল। ‘এমন মেয়ে পেটে ধরার চেয়ে বিষ খেয়ে মরে যাওয়া ভাল। আমাদের ঘরে হলে কেটে দরিয়াতে ভাসিয়ে দিতাম। ছি ছি। ভাল ভাল ভাল, যেন কিছুই জানে না। ভাল’র এই নমুনা।‘ এতদিন সবাই পুতুল ভালবাসত। যেই মানুষের মত কথা বলা শুরু করলাম, পুতুল আর কারো ভাল লাগছে না।
এতদিন গাঁয়ের বাপ- মাদের কাছে আমি ছিলাম দৃষ্টান্ত। বড় হয়ে স্বভাবে চরিত্রে যেন আমার মত হয় এই কথা অনেক মেয়ে উঠতে বসতে শুনেছে। একদিনেই সেই চূড়া থেকে আস্তাকূড়ে নিক্ষিপ্ত হলাম। মা দোষ দেয় তাঁর কপালের। দোষ দেয় আমার বাবার, সে কেন মরে গেল। পাড়া প্রতিবেশি এত মারফতি কথায় নাই। তারা সরাসরি আমার দোষ দেখে। আমি তাদের সাথে একমত।
বিয়ে ভাঙার পরদিন শেফালি এসেছিল। শেফালি একসময় কাজে কর্মে মাকে সাহায্য করত। আমার স্কুল ড্রেস ধুয়ে দিত। ক’দিন আগে শ্বশুর বাড়ির তাড়া খেয়ে বাপের বাড়ি এসে জমা হয়েছে। ওর জামাই রিকসা চালক। ওর বাপ প্রতিজ্ঞা করেছিল জামাইকে একটা রিকশা কিনে দিবে। সেটা না দিয়েই বেচারা মারা গেল।
শেফালির জামাই ফরিদ প্রতিদিন ভাড়া রিকসা জমা দিয়ে বাড়ি আসলেই কথাটা মনে পড়ে আর শেফালিকে একচোট ঠেঙায়। নিত্যদিনের রুটিন। এতেও যখন কাজ হচ্ছিল না তখন সেদিন শেফালিকে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলে ফরিদ। তাকে অবশ্য খুব বেশি দোষ দেয়া যায় না। সারাদিন রিকসা টেনে সত্তুর-আশি টাকা রুজি হয়। এর মধ্যে কুড়ি টাকা দিতে হয়ে রিকসার মালিককে। নিজের একটা রিকসা থাকলে ডেইলি বিশ টাকা করে বাঁচত। মাসে ছয়শ টাকা। এদিকে বজ্জাত শ্বশুর রিকসা দিবে বলে মেয়ে গছিয়ে দিয়ে রিকসা দেয়ার নাম নাই। নিজেই মরে ভূত। এই ছয়শ টাকার হিসাবটা সেদিন একেবারে মাথাছাড়া দিয়ে উঠলে বউকে পিটিয়ে শুধু আধমরা করেনি, রিকসা করে মরা বাপের ভিটায় পৌঁছে দিয়ে গেছে।
শেফালি বলল, ‘মানুষ কত রকম কথা যে লাগাচ্ছে। এক সময় তোমাদের নিমক খাইছি। তাই খারাপ লাগে বুবু।’
বললাম, ‘শোন, যার সাথে আমার বিয়ে হওয়ার কথা, আমি তার যোগ্য না। তার মোটর সাইকেল ছাড়া হবে না। আমার বাপেরও মোটর সাইকেল ছিল না। তার রঙিন টিভি ছাড়া চলে না, সে এম এ পাশ। আমার বিএ পড়াই এখনো শেষ হইল না। তার বাপ আছে, আমার বাপ নাই। অত যোগ্য লোকের ঘরে আমি যেতে চাই না।‘
‘আপা যে কি কন। আপনার মত মাইয়া এই গেরামে কয়টা আছে? ঐ বাপ-বেটা হইল আসলে বজ্জাত গুষ্ঠি। আমি মূর্খ মাইয়া মানুষ হইলেও এইসব বুঝি। কাজটা ভাল হইছে। বিয়ার নামে হাবিয়া দোযখে যাওয়ার দরকার কি। মানুষ বিয়া করে সুখ-শান্তির জন্য। সেইটাই যদি না থাকে তাইলে আর থাকল টা কি?‘
মা নাওয়া খাওয়া বলতে গেলে ছেড়ে দিয়েছেন। ছোট মামা অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কারো সাথে কোন কথাবার্তা বলছেন না। আমরা ভয় পেয়ে গেলাম।
তৃতীয় দিন বিকেল বেলা ঘরে শুয়ে আছি। অজস্র ভাবনা মৌমাছির মত মাথার চারপাশে ভোঁ ভোঁ করছে। হঠাৎ বাইরে থেকে ‘যুথী! যুথী!’ ডাক।
দরজা খুলে দেখি আমাদের স্কুল টিচার সিতারা আপা দাঁড়িয়ে। মাথায় ছাতা। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা, আবহাওয়া যাই হোক না কেন এই ছাতা ছাড়া আপাকে কখনো দেখি নাই। হাতে হ্যান্ড ব্যাগ। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে দুপাশে একটু চামড়া ওঠা। এটাও তাঁর সব সময়ের সাথী।
আপাকে দেখে বুকটা ধ্বক করে উঠল। খুব কড়া টিচার ছিলেন। মেয়েদের কাছে মূর্তিমান আতংক। একবার আমাকে সারাক্লাসে বেঞ্চের উপরে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। এখনো স্কুলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বুকে শিরশির করে। মনেহয় সিতারা আপা ডেকে নিয়ে কানমলে দিবেন।
আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘তোমার সাথে দেখা করতে চলে এলাম। আই এম প্রাউড অব ইয়ু।‘
আপা কি বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
‘এভাবেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। ব্রাভো! ব্রাভো! কাউকে না কাউকে তো দাঁড়াতে হবে। নইলে লড়াইটা শুরু হবে কি করে!’
মা’র সাথে অনেকক্ষণ কথা বলে আপা বিদায় নিলেন।
সিতারা আপা আশায় অনেক কাজের কাজ হয়েছে। ভেতরে ভেতরে আমিও কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। তিনি একটা নাড়া দিয়ে গেলেন। আমি গা ঝাড়া দিয়ে উঠলাম। সবচেয়ে বড় উপকার যা হয়েছে তা হল মা স্বাভাবিক হয়েছেন। সিতারা আপা যাওয়ার পর থেকে তিনি আবার কথা-বার্তা খাওয়া দাওয়া শুরু করেছেন। আমি কল্পনাও করিনি সিতারা আপা ছুটে আসবেন আমার বাড়িতে। বলবেন, ‘এমন মেয়ে তৈরি করার ব্রত নিয়েই তো আমি শিক্ষকতা শুরু করেছিলাম।‘
সিতারা আপা যেন ফেরেশতা হয়ে এসে আমাকে পথ দেখিয়ে গেলেন। সিতারা আপার ‘ব্রাভো! ব্রাভো!’ যে কত বিশাল তা যারা আমাদের সাথে একস্কুলে পড়েনি তারা কেউ বুঝতে পারবে না। তিনি বলে গেলেন, ‘তুমি ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-মন্ত্রী-এমপি হলেও এমন খুশি হতাম না।‘
তারপর দিন থেকে আমি কলেজে যাওয়া আসা-শুরু করলাম, পথে ঘাটের টিপ্পনি উপেক্ষা করে।

মাসখানেক পর।
আমি প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে দাঁড়িয়ে আছি। অনেক্ষণ ধরে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার পর ভেতরে ঢোকার অনুমতি পেলাম। পিয়ন বার বার এসে জিজ্ঞেস করেছে, কি চান? আমি স্যারের সাথে দেখা করতে চান কেন সেটা বলেন।
সেটা স্যার কে বলব। আপনাকে কেন বলব? আপনি কি স্যার।
দেখা হবে না। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। নিষেধ আছে।
আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকব। স্যার বের হলে কথা বলব।
প্রায় ঘন্টা খানেক দাঁড়িয়ে থাকার পরে স্যার ঢোকার অনুমতি দিলেন। আগে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম এখন ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি। প্রিন্সিপালের অত্যন্ত রাগী এবং কড়া মানুষ। চেহারা স্কুলের হেডমাস্টারের মত ভয়ংকর। চোখে কুচকালো মোটাফ্রেমের চশমা। নাকের দুপাশে হিটলারি স্টাইলের গোঁফ। সেটা তাঁকে তিনি যত না ভয়ংকর তার চেয়ে বেশি ভয়ংকর করে তুলেছে। তাঁর চেহারার কথা বলে অনায়াসে যে কোন বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানো যায়। আমার ধারণা স্যারের আত্মীয়-প্রতিবেশিরা বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর সময় এই সুযোগটি হাতছাড়া করে না।
আমি প্রায় পনের মিনিট দাঁড়িয়ে আছি। স্যার কাজ করেই যাচ্ছেন। চেম্বারে আর কেউ আছে সেটা ভুলে গেছেন। স্যার কি ইচ্ছা করে আমাকে উপেক্ষা করছেন। বাইরে জোর করে দাঁড়িয়ে ছিলাম তাই শাস্তি। দেখি কতক্ষণ এ শাস্তি চলে।
বেশিক্ষণ চলল না। স্যার মুখ তুলে জজ্ঞেস করলেন কি চাও?
স্যার আমার একটা জরুরি কথা ছিল।
সেটাই তো জানতে চাচ্ছি।
স্যার আমাদের কলেজে মেয়েদের জন্য কোন ক্যান্টিন নেই। ঐ দোকানটাতে সব ছেলেরা গিজ গিজ করে। চা-সিগারেট খায়। মেয়েরা যেতে পারে না। সারাদিন ক্লাস থাকলে মেয়েদের খুব কষ্ট হয়।
দেখ, আমাদের কলেজটা খুব ছোট। জায়গা নেই। আমাদের বিশেষ কিছু করার নেই। এই নিয়ে আগেও অনেকবার আলাপ আলোচনা হয়ে গেছে। এই চ্যাপ্টার শেষ। যাও।
যাওটা বেশ রাগ নিয়ে বললেন। এরপর না বের হয়ে পারা যায় না।
আমি তবু বললাম, স্যার, আমি তো এইটা বলতে আসি নি। আমি বলতে চাই স্যার, মেয়েদের কমন রুমে এক কোনায় একটা টেবিল বসিয়ে দিলে, কেউ এসে যদি ঘরে বানানো কিছু বিক্রি করে তবে—–
মানে?
স্যার আমি বলতে চাইছিলাম অমন কোন ক্যান্টিন না। জাস্ট একটা টেবিল বসিয়ে যদি একজন কিছু সিঙ্গারা টিংগারা বিক্রি করে আমাদের বেশ উপকার হয়।
বলছিনা হবে না। যাও।
যাও টা বেশ হুংকার দিয়ে বললেন। এরপর দাঁড়ানো মানে ফাঁসিতে ঝুলে পড়া।
দুদিন পরে আমি আবার গেলাম। এবার কথাটা অন্যভাবে পাড়লাম। বললাম, স্যার আমিই বাড়ি থেকে সিঙ্গারা এনে বিক্রি করব। আপনি যদি অনুমতি দেন। আমার এতে অনেক উপকার হবে, অন্যদেরও হবে। নিজেকে খুব বিপন্না হিসেবে উপস্থাপন করলাম।
স্যার রাজি হলেন। বললেন আগে সিঙ্গারা বানিয়ে এনে আমাকে খাইয়ে দেখাও। যদি পছন্দ হয় অনুমতি পাবে।
শেফালি, ফৈজি আর নাজু – এই তিনজনকে নিয়ে আমি একটা দল তৈরি করলাম। এদের সকলের ইতিহাস শেফালির মত। স্বামী পরিত্যাক্তা। এদেরকে সিঙারা বানানো শেখালাম। সকালে এরা তিনজন আলু কাটে। ভাজি করে। আমি আটা তৈরি করি। সেই আলু-সিঙারা শেফালির মাথায় চাপে। ও নিয়ে যায় কলেজে। মেয়েদের কমন রুমে। সেখানে কোনায় একটা ক্ষুদ্র টেবিলের পেছনে দাঁড়িয়ে ও সিঙ্গারা বিক্রি করে।
প্রথম দিন সিঙ্গারা নিয়েছিল তিরিশটা। শেষ হয়ে যাওয়ার পর মেয়েরা পই পই করে শেফালিকে বলে দিল পরের দিন যেন বেশি করে আনে। সিঙ্গারা বানাতে খরচ হয় দেড়টাকা। বিক্রি হয় দুইটাকা।
দিনকে দিন বিক্রি বাড়তে থাকে। আগে মেয়েদের জন্য কলেজে শুকনো বাদাম ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সিঙ্গারার উপরে তাই মেয়েরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। কলেজের গন্ডি ছাড়িয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে সিঙ্গারার খুশবু। বাজারের কনফেকশনারী দোকানগুলোও আমাদের সিঙ্গারা রাখতে চায়। আমরা সাপ্লাই দিয়ে শেষ করতে পারি না।
আসা যাওয়ার পথে ছেলেরা টিপ্পনি কাটে। বলে, সিঙ্গারাওয়ালী যায়। বলুক,তাতে কি আসে যায়।
আমি দল বাড়াই। গাঁয়ের মেয়েরা একের পর এক যুক্ত হতে থাকে। বাড়ির একপাশে একটা দোচালা বানাই। ওখানে ওরা সিঙ্গারা বানায়। সেলাই করে। জামা বানায়, কাঁথা তৈরি করে। আমি বাজারের গার্মেন্টস দোকানে দোকানে ঘুরে মেয়েদের বানানো জামার অর্ডার নিই।
আমরা শুধু সিঙ্গারা আর জামা-কাঁথাতে থাকি না। আমাদের খামার হয়। সেখানে হাঁস-মুরগি ডিম পাড়ে। গরু দুধ দেয়। একে একে অসহায় মেয়েরা আমার কাছে আসতে থাকে। এক দুই করে পঞ্চাশ, ষাট। যারা আসেনি তারা তাদের জামাই মার-ধোর করলে হুমকি দেয়, যুথী আপার কাছে চলে যাব।
ব্যাংকের লোকেরা আসে। তারা ঋণ দিতে চায়। আমাদের ঋণ লাগে না। তবু তারা ঋণ দিবেই। আমি একজনকে দেখিয়ে বলি, ওকে ঋণ দিন। ওর খুব দরকার। তার ঘর দরকার। একটা সেলাই মেশিন দরকার। তারা ওকে দেবে না। ব্যাংকের অদ্ভূত নিয়ম যার দরকার নেই তার পিছে ঘুরবে। যার দরকার তাকে দিবে না।
আমাদের পিছে লাগে এনজিও। আগে গ্রামের মেয়েরা তাদের জন্য জামা বানাত, কাঁথা বানাত। সেগুলো তারা সামান্য দামে কিনে নিত। এখন আমরা নিজেরাই সেগুলো দোকানে বিক্রি করি। বাজারে আমাদের একটা শো রুম আছে। সেখানে বিক্রি হয়। ছোট মামা সেই শো রুম বসেন।
এরপর আসে সাংবাদিক। আমাকে নিয়ে রিপোর্ট করতে হবে। আমি পাত্তা দিই না। কিন্তু একজন পিছু ছাড়ে না। সে রিপোর্ট করবেই। ভালকথা। সে ঘুরে ঘুরে আমাদের কাজকর্ম দেখে। মেয়েদের সাথে কথা বলে। আমাদের আয়-রোজগারের খবর নেয়। তারপর সে প্রস্তাব দেয় রিপোর্ট করার জন্য তার বেশ খরচাপাতি আছে। এই খরচ আমাদেরকেই জোগাতে হবে। বেশ মোটা অংকের খরচ।
আমরা বলি রিপোর্ট করার দরকার নাই। কিন্তু সে রিপোর্ট করবেই। আমরা খরচ না দিলে উল্ট-পাল্টা করবে। আমরা বলি, ‘মরেন গিয়া।‘
কয়দিন পরে সে একগাদা খবরের কাগজ বোঝায় হাতে হাজির হয়। আমি বলি সাংবাদিকতা ছেড়ে কি হকারি ধরলেন? জবাব না দিয়ে সে আমার দিকে একটা কাগজ বাড়িয়ে দিল। সেখানে এক বিরাট অনুসন্ধানী রিপোর্ট। সে রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, আমি কিভাবে গ্রামের সহজ সরল মেয়েদেরকে ফুসলিয়ে তাদের সংসার ভেঙ্গে ফেলি। তারপর তাদেরকে এনে বিনা পয়সায় খাটিয়ে আমি পয়সা কামাই করি। এমনকি আমি তাদেরকে দিয়ে নানা সমাজ বিরোধী কর্মকান্ড চালাই বলেও খবরে প্রকাশ। রাতের বেলা এখানে বখাটে লোকজন আসে। তাদের মনোরঞ্জনের জন্য আমি মেয়েদের লাগিয়ে দিই। লোকটা্কে গলাটিপে মেরে ফেলতে ইচ্ছে হল।
আমি তবু ঠাণ্ডা মাথায় বললাম, ‘বানিয়ে বানিয়ে আপনি এসব কি লিখেছেন? এইসব জঘন্য কথা কিভাবে লিখতে পারলেন? বিবেক বলে কি কিছু নাই?
– আপনাকে তো বলেছিলাম, আপনি সহযোগিতা না করলে আমি নিজের মত রিপোর্ট করব।
– তাই বলে এভাবে জঘন্য মিথ্যা কথা লিখবেন।
– সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা তো করতেই হবে।
ঘৃণায় আমার গা রিরি করে উঠল। বললাম, তাতে আমার এমন কিছু যায় আসে না। আপনার এই কাগজ মানুষ বাচ্চাদের শুচু করানোর জন্যও ইউজ করে না। আমার মনে হয় না কেউ পয়সা দিয়ে এই কাগজ কেনে। এই পেপার নামও কেউ জানে না।
সে হাসল। শয়তানের হাসি। বলল, আপনি ঠিক বলেছেন। কেউ কেনে না। কেউ পড়ে না। কেউ নামও জানে না। সব ঠিক। তবে আমি এই গ্রামের ও আসে পাশের গ্রামের সবার কাছে এইগুলো ফ্রী ফ্রী বিলি করব।
রাগে আমার মাথায় আগুন ধরে গেল। মনে হচ্ছিল, ছেলেটাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলি। বললাম, আপনি চান টা কি? সে বলল, কি চাই আপনি ভালো করে জানেন। আমার খরচাপাতি। সেটা দিয়ে দিলেই আমি আর এগুলো বিলি করব না। সব কাগজ আপনার কাছে রেখে যাব।
বললাম ঠিক আছে। আপনি বসেন, আমি ব্যবস্থা করছি। যা চান তাই পাবেন।
তাকে বসতে বলে আমি বের হয়ে গেলাম। গিয়ে শেফালি আর বান্টুলিকে ডাকলাম। বান্টুলি গায়ে গতরে বেশ বড়সড়। লম্বা চওড়া কালো শরীর। খান্ডারনি মহিলা বলে ওর কুখ্যাতি আছে। ওদের সাথে পরামর্শ করলাম।
ওরা চা নিয়ে সাংবাদিক ভাইয়ের কাছে গেল। চা হাতে নিয়ে ভদ্রলোক চুমুক দিতে গেলেন। আচমকা বান্টুলি ভদ্রলোকের মুখ চেপে ধরল। কাপছুটে গরম চা গায়ে পড়লে ভদ্রলোক চিৎকার করার অবসর পর্যন্ত পেল না। শেফালির হাতে থাকা ওড়না দিয়ে ভদ্রলোকের মুখ বেঁধের ফেলল। বান্টুলি লোকটাকে এমনভাবে ধরল, সে গোঁ গোঁ করা ছাড়া আর কিছু করার উপায় রইল না। তার হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখল।
সন্ধ্যার পরে যখন মেয়েরা সব বাড়িতে চলে গেলে তাকে আমরা মুরগির খোঁয়াড়ে ফেলে রাখলাম। আমি বল্লাম, ‘তুমি আমাকে চেন নাই। সাংবাদিক দেখে সম্মান দিয়েছিলাম। কিন্তু আমি যে কি জিনিস তোমার জানা উচিত ছিল। এখানে আসার আগে ইতিহাসটা ভাল করে পড়ে আসলে ভাল করতে। আমার পিছে লাগতে আসার মজাটা তুমি টের পাবে।‘
রাতের বেলা মুখে কালি মেখে বাঁধন খুলে দিয়ে, আমরা চোর চোর বলে চিৎকার শুরু করে দিলাম। গ্রামের লোকজন এসে গণপিটুনি দিয়ে আধমরা করে দিল।
এরপর দিন ভালই যাচ্ছিল। তবু মাঝে দিন কাটে না। ভাল লাগে না। কাজ করতে ইচ্ছে করে না। সারা দিন শুয়ে থাকি। এর মাঝে আবার এক ব্যাংকার আমার পিছে লাগে। কৃষি ব্যাংকের ম্যানেজার।
কিন্তু তার উদ্দেশ্য ঠিক পরিষ্কার না। ঋণ দিতে চায় বলে মনে হয় না। বলে, এদিকে একটা প্রজেক্ট দেখতে এসেছি, তাই আপনার প্রজেক্টগুলোও দেখে যেতে চাই। অনেক কিছু শেখার আছে। আমি পরিষ্কার বলি, কোন লোন আমি নেব না। ভদ্রলোক বলে, সেটা আমি জানি না মনে করছেন। আপনার সবকিছু আমি জানি। আপনার সব খবরাখবর আমি জেনে গেছি। বললাম না অনেক কিছু শেখার আছে।
ভদ্রলোক মাঝে মাঝেই আসেন। নানান ছুতোয়। এদিকে একটা পার্টির সাথে দেখা করতে এসেছি। একটা প্রজেক্ট দেখতে এসেছি। বিকেলে একটু হাঁটতে বেরিয়েছি। এদিকে হাঁটাহাঁটি করলে বেশ ফ্রেশ এয়ার পাওয়া যায়।
এসে আমার সাথে গল্প করেন। কোন কজের গল্প না। হাবিজাবি। মার সাথেও বেশ জমিয়ে নিয়েছেন। সেই বিয়ে ভাঙার পর থেকে মা আমার সাথে স্বাভাবিক না। তিনি তাঁর মত থাকেন, আমি আমার মত কাজ করে যাই। মাঝে মাঝে আত্মীয় স্বজনের কাছে হা-হুতাশ করেন। আমি গা করি না।
কিন্তু এই ম্যানেজার এলে মা বেশ খুশি হন। আমার সম্পর্কে হাজারটা অভিযোগ করেন। যেন সে আমাদের আত্মীয়। ভদ্রলোক উল্টো মার কাছে আমার তারিফ করেন। মা তার কথা জিজ্ঞেস করেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ভদ্রলোকের বাবা মারা গেছে ছোট বেলায়। কষ্ট করে মানুষ হয়েছে। ভাই-বোনদের প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। এইসব করতে করতে কখন যে বেলা বেড়ে গেছে খেয়াল ছিল না। নিজে বিয়ে থা করার অবকাশ পান নি। এই খবরটা শুনে মা বিশদ খুশি।
লোকটা এলে যে আমারও যে খারাপ লাগে তা না। যেদিন আমার দিন কাটে না, সেদিন তার কথা মনে হয়।
দু একদিন না এলে মাও ছটপট করেন। ইদানিং মা বড় একা। লোকটা এলে যেন একটু দম ফেলে। মা একদিন আমাকে বলে, ভয়ে ভয়ে বলে, তুই সাইজুদ্দীনকে বিয়ে করে ফেল না।
সাইজুদ্দীন না টা কে।
ঐ যে ব্যাংকের ম্যানেজার।
আশ্চর্য আমি আধবুড়োটার নামটাই জানতাম না।
আধবুড়ো বলছিস কেন? একটু বয়স হয়েছে। এখনো দাঁড়ি-গোঁফ পাকেনি।
না, মা তা কি করে হয়।
ম্যানেজার তবু আমাদের আসে। গল্প করে। ভদ্রলোক আমাকে মুগ্ধ করার নানান উপায়ে চেষ্টা করছে। কিন্তু আমি মুগ্ধ হই কি না, এ নিয়ে সারাক্ষণ দোটানায় থাকে।
কি জানি, হয়ত একদিন তাকে বিয়ে করেই ফেলব। এই কথাটা ভাবতে আমার খারাপ লাগে না।
—কালো মেয়ের পায়ের তলায় আলো
—আন্‌ওয়ার এম হুসাইন

–সমাপ্ত–
[অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১ উপলক্ষ্যে পেন্সিল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হচ্ছে আমার গল্পগ্রন্থ ‘প্রত্যুষের গল্প’

VN:R_U [1.9.22_1171]
রেটিং করুন:
Rating: 5.0/5 (1 vote cast)
VN:R_U [1.9.22_1171]
Rating: 0 (from 0 votes)
কালো মেয়ের পায়ের তলায় আলো (শেষ কিস্তি), 5.0 out of 5 based on 1 rating
এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের,লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

৪ টি মন্তব্য (লেখকের ২টি) | ২ জন মন্তব্যকারী

  1. মুরুব্বী : ১১-০১-২০২১ | ১০:৫৩ |

    সার্থক গল্প উপহারের জন্য প্রথমেই অভিনন্দন মি. আনু আনোয়ার। দীর্ঘদিন পর শব্দনীড় আপনাকে পেয়েছে এতে শব্দনীড়ও আনন্দিত।

    একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘প্রত্যুষের গল্প’র সাফল্য কামনা করছি। https://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_rose.gif

    VN:R_U [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)
  2. নিতাই বাবু : ১২-০১-২০২১ | ৯:৩২ |

    "কালো মেয়ের পায়ের তলায় আলো" শিরোনামে

    আগের পর্বটি পড়েছি। খুবই ভালো লেগেছে। এই পর্বটিও পড়লাম! বেশ ভালোই লাগলো। মোটকথা সময়োপযোগী একটা ধারাবাহিক লেখা। 

    লেখকের জন্য শুভকামনা থাকলো। 

     

     

    আপনার 

    VN:R_U [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)

মন্তব্য করুন