90

প্রচন্ড বৃষ্টি। আপাদমস্তক রেইনকোটে আবৃত শিহাব। বাইক নিয়ে একটা মার্কেটের সামনে আরো কয়েকজন বাইক রাইডারদের সাথে ভিজছে। বাধ্য হয়েই সবাইকে ভিজতে হচ্ছে। মার্কেটের ভিতরে এত পরিমান মানুষ, আর কেউ ঢুকতে পারছে না। বাতাসের বেগও অনেক, তাই সামনে না এগিয়ে বৃষ্টি কমার অপেক্ষায় খোলা আকাশের নিচে ভিজতে থাকে শিহাব।

একটা সিগারেট টানতে পারলে ভালো লাগতো। ভাবতেই বড্ড ‘ধুমপানের তেষ্টা’ জাগলেও নীরব থাকে সে। মফস্বল সাংবাদিকদের কখনো কখনো নীরব থাকতে হয়।

দ্রুত বেগে একটা সিএনজি অটোরিকশা রাস্তার জমা জল ছিটিয়ে শিহাবকে পাশ কাটায়। ভিজিয়ে দেয় শিহাবকে। কিছু ছিটা চোখে পড়ে, জ্বলে উঠে বাম পাশের চোখ। আপনাতেই অশ্রাব্য একটা গালি এসে যায়। কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দে পরিণত হবার আগেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে সে।

মফস্বল সাংবাদিকেরা একটু মন খুলে, ইচ্ছামত কাউকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিও দিতে পারে না। প্রকাশ্যে তো নয়ই। সবসময় একটা নিয়ন্ত্রণের ভিতরে থাকতে হয় তাদেরকে।

শিহাব যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, রাস্তার ঠিক ওপাশেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। সেদিকে চোখ যায় শিহাবের। কেন জানি কাশেমের কথা মনে পড়ে। এই অফিসের পিওন। তবে পিওন হলেও খুব ক্ষমতাশালী। মূলত অফিসটির সার্বিক কার্যক্রম সে-ই আসলে নিয়ন্ত্রণ করে। কয়েকটা বাড়ির মালিক এবং নামে বেনামে ওর আরও অনেক সম্পত্তির কথা শুনেছে শিহাব।

কাশেমের এই অবৈধ প্রভাবের জন্য এই এলাকা এবং পাশের এলাকার মফস্বল সাংবাদিকদের কি কোনো ভূমিকা নেই? এরা প্রায় প্রতিদিন কিংবা যখন ইচ্ছা হলো অথবা কেউ কেউ মাসের নির্দিষ্ট কোনো দিনে কাশেমের সাথে ‘চা পান’ করতে আসে। চলে বন্ধুত্বপূর্ণ গল্পগুজব, চায়ের সাথে সিগারেট আর যাবার সময় খাম। এই তিন এর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে একটা ‘সাইক্লিক অর্ডার’। তা থেকে মফস্বল সাংবাদিকেরা কেনো জানি আর সহজে বের-ই হতে পারেন না।

জমির শ্রেণি পরিবর্তন সহ নানারকম অবৈধ কাজে আসে প্রচুর অবৈধ টাকা। এই টাকা দিয়েই সিস্টেমের ভিতরে থেকে কাশেমরা নিজেদের জন্য এক আলাদা রাজত্ব তৈরী করে। সবাইকে ম্যানেজ করেই অবশ্য। মফস্বলে আবার সবাই কেনো জানি দ্রুত ম্যানেজ ও হতে পছন্দ করেন।

তবে কি কোনো সাংবাদিক এই কাশেমদের বিরুদ্ধে লেখেন না? সিস্টেমের এই অনিয়ম তুলে ধরেন না তাদের প্রতিবেদনে?

এরকম প্রশ্নে একটু বিব্রত হয় শিহাব। নিজের ভিতরের শিহাব আর মফস্বল সাংবাদিক শিহাবের ভিতরে চলে ক্ষণিকের টানাপোড়েন। শেষে ভিতরের শিহাবই উত্তর দেয় মফস্বল সাংবাদিকের পক্ষ হয়ে,

– হ্যা, নিউজ হয়তো। কেউ কেউ করে। এরা হলো যারা বছর ধরে প্রতিমাসে কাশেমের থেকে খাম নেয়। এভাবে জানুয়ারী থেকে অক্টোবর পর্যন্ত লাগাতার খাম গ্রহন শেষে, কোনো কারণে যদি নভেম্বর মাসে কাঙ্খিত খাম দেয়া বন্ধ করে কাশেম..

ঠিক এর পরের দিনই পত্রিকায় বক্স করে বিশাল নিউজ! শিরোনাম?

” সাবরেজিষ্ট্রি অফিসে সর্বময় ক্ষমতাধর কে এই কাশেম??”

বাইনচোত!! কে এই কাশেম?
এখন কাশেমকে আর চেনো না? মুফতে চা-সিগারেট খাওয়া আর মাসে মাসে খাম নেবার সময়তো কাশেমই ছিলো ধ্যান-জ্ঞান। এখন আর চেনো না?

ভিতরের শিহাবের গালিতে কিছুটা ম্রিয়মান হলেও নিজেকে সামলে নেয় মফস্বল সাংবাদিক শিহাব। কারণ ভিতরের দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত সাংবাদিক শিহাবেরই জিত হবে। সবসময় ভিতরের মানুষটার কথামতো চলে মফস্বল সাংবাদিকতা করা যায়না।

#মামুনের_অণুগল্প_৫৫৩

VN:F [1.9.22_1171]
রেটিং করুন:
Rating: 5.0/5 (2 votes cast)
অণুগল্প-৫৫৩ // কে এই কাশেম??, 5.0 out of 5 based on 2 ratings
FavoriteLoadingলেখা প্রিয়তে নিন

মামুন সম্পর্কে

একজন মানুষ, আজীবন একাকি। লেখালেখির শুরু সেই ছেলেবেলায়। ক্যাডেট কলেজের বন্দী জীবনের একচিলতে 'রিফ্রেশমেন্ট' হিসেবে এই সাহিত্যচর্চাকে কাছে টেনেছিলাম। এরপর দীর্ঘ বিরতি... নিজের চল্লিশ বছরে এসে আবারো লেখালখি ফেসবুকে। পরে ব্লগে প্রবেশ। তারপর সময়ের কাছে নিজেকে ছেড়ে দেয়া। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬ তে 'অপেক্ষা' নামের প্রথম গল্পগ্রন্থ দিয়ে লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। বইমেলা ২০১৭ তে তিনটি গ্রন্থ- 'ছায়াসঙ্গী'- দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ, 'ঘুঙ্গরু আর মেঙ্গরু'- উপন্যাস এবং 'শেষ তৈলচিত্র'- কাব্যগ্রন্থ নিয়ে সাহিত্যের প্রধান তিনটি প্ল্যাটফর্মে নিজের নাম রেখেছি। কাজ চলছে ১০০০ অণুগল্প নিয়ে 'অণুগল্প সংকলন' নামের গ্রন্থটির। পেশাগত জীবনে বিচিত্র অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। একজন অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। পোষাক শিল্পের কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। লেখালেখির পাশাপাশি সাংবাদিকতা করছি। লেখার ক্ষমতা আমি আমার ঈশ্বরের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছি। তাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লিখেই যেতে হবে আমাকে।
এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের,লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর।
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে অণুগল্প-এ এবং ট্যাগ হয়েছে , , স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

১ Response to অণুগল্প-৫৫৩ // কে এই কাশেম??

  1. মুরুব্বী বলেছেনঃ

    শিহাব চরিত্রটিতে আমি আমার নিজেকে যেন খুঁজে পাই। সে কারণেই জানি না সম্ভবত আপনার অণুগল্প আমার ভীষণ পছন্দ হয়। অভিনন্দন মি. আল মামুন খান। শুভেচ্ছা। https://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_rose.gif

    VN:F [1.9.22_1171]
    Rating: +1 (from 1 vote)

মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।