রূপকথাঃ এক যে বাঘ

প্রাপ্তবয়স্কদের রূপকথা, ছোটরা এড়িয়ে যাও-

তারপর হলো কি শিয়াল এসে দেখে বাঘ বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে। বাঘের চোখ বন্ধ, কপালের চামড়া ব্যাথায় কুঁচকে আছে। শিয়াল জিজ্ঞেস করলো,
– বাঘ মামা, কি হয়েছে! পেটে গ্যাসের ট্রাবল না এপেনডিসাইটিসের পেইন?

বাঘ এপাশ-ওপাশ করতে করতেই চোখ খুলে তাকালো, তারপর চোখ বন্ধ করে কাতর স্বরে বললো,
– শিয়াল পণ্ডিত যে! তা কখন এলে?

“পণ্ডিত” বললে শিয়ালের খুব রাগ হয়। তোমরাই বলো, শিয়ালের সেই পণ্ডিতির যুগ কি আর আছে! টকশোজীবী এবং চারুকলা ও বুয়েটের কমার্স বিভাগের বিজ্ঞানীরা এখন সর্ববিষয়ে পণ্ডিতি করে। এসব দেখে শিয়ালের খুব কষ্ট হয়। হাজার বছরের ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে ওরা শিয়াল পণ্ডিতের লাখ বছরের পণ্ডিতির ঐতিহ্যটাও দখল করে নিয়েছে। এপ্লায়েড হিস্ট্রি এন্ড সহমতিয়ান ফিলোসফিতে পিএইচডিধারী ড. শিয়াল তাই নামের শেষে ‘স্যার’ সম্বোধনেই স্বস্তিবোধ করতেন।

সম্প্রতি ঘটেছে আরেক কাণ্ড, তোমাদের মত একদল দুষ্টু কি করেছে শুনো, সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা “স্যার” সম্বোধনটা “ড. শিয়াল”-এর আগে বসিয়ে ভাইরাল করে দিয়েছে। সবাই এখন তাকে ডাকে “স্যার ড. শিয়াল”।এই সম্বোধনে প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তি হলেও ‘নাইটহুড’ ছাড়াই ‘স্যার’ বানিয়ে দেওয়ায় শিয়াল কিন্তু দুষ্টদের সকল দুষ্টুমি ক্ষমা করে দিয়েছে। বাঘের প্রশ্নের উত্তরে শিয়াল বললো,
– বাঘমামা, স্যার শিয়ালকে তুমি শিয়াল পণ্ডিত ডাকছো কেনো! শরীর কি বেশী খারাপ! মাথা এলোমেলো হয়ে গেছে!

শিয়ালের কথায় বাঘ চোখ মেললো। চোখ টকটকে লাল হয়ে আছে। শিয়ালের চোখে চোখ রেখে হুংকার দিলো,
– মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ। আমি কি ইন্সটিট্যুট অফ চা-ছপ-সিঙ্গারা-সমুচা ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজির ভিসি টাইগারুজ্জামান যে তুমি আমাকে ‘মামা’ সম্বোধন করে ডাকবে! বহুবার বলেছি আমাকে “মাননীয় বাঘমশাই” বা “বিকল্পহীন বনরাজ” বলে ডাকবে, এই নামে ডাকতে সমস্যা হলে “লিডার” বলে ডাকবে।

বাঘের হুংকারের শুরুতেই ঘরের দেয়ালে থাকা দু’টো টিকটিকি আর জানালার বাইরে চড়তে থাকা ক’টা রামছাগল কানখাড়া করেছিল। বাঘের হুংকার শেষ হতেই তারা একসাথে শ্লোগান দিলো, “সহমত লিডার.. সহমত লিডার।” সম্মিলিত টিকটিকি ও রামছাগল জোটের শ্লোগানে বাঘের মন কিছুটা নরম হলো।

তারপর হলো কি, শিয়ালের কানের কাছে মুখ নিয়ে বাঘ ফিসফিসিয়ে বললো,
– ইউ হ্যাভ টু বুঝতে হবে মাই কৌশল অব ক্যারিশমাটিক লিডারশিপ। আমি রোজ লাঞ্চ আর ডিনারে মাটন তেহারি খাচ্ছি তবু রামছাগলরা ‘সহমত লিডার’ শ্লোগান দিচ্ছে। সো, নো হাংকিপাংকি, ডোন্ট কল মি “মামা”, ক্লিয়ার স্যার ড. শিয়াল!”

বাঘের কথায় শিয়াল ভয় পেয়েছে। তবু ভয় না পাওয়ার অভিনয় করে ভক্তি ভয়গদগদ কণ্ঠে বললো,
– সহমত লিডার। এই জঙ্গলে তুমি আমাদের ‘বনবন্ধু।” কেউ পারলে তোমার বিকল্প দেখাক, চ্যালেঞ্জ দিলাম।মাই বক্তব্য কি ইউর কাছে ক্লিয়ার, লিডার!

শিয়ালের কথা শেষ হতেই সম্মিলিত টিকটিকি ও রামছাগল জোটের নেতা-কর্মীরা শ্লোগান দিলো, “সহমত স্যার শিয়াল.. সহমত স্যার শিয়াল.. আমাদের লিডারের কোনো বিকল্প নেই।” শিয়ালের বক্তব্য আর শ্লোগানে বাঘের মন ভালো হলেও শরীর কিন্তু খারাপ। বাঘ আবার এপাশ-ওপাশ করতে শুরু করায় শেয়াল বললো,
– লিডার, চলো তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।

বাঘ হুংকার দিলো,
– ডোন্ট আন্ডার ইস্টিমেট মি, স্যার ড. শিয়াল। আমি আমেরিকার কম্পাউন্ডারের কাছে যাই, ইউরোপের ওয়ার্ড বয়ের কাছে, পাশের জঙ্গলের কবিরাজের কাছে যাই, কিন্তু ইউ হ্যাভ টু বুঝতে হবে, এই জঙ্গলের একটা প্রোটোকল আছে, এখানে ডাক্তারকে হাসপাতালসহ আমার কাছে আসতে হয়।

শিয়াল ‘স্যরি’ বলে দ্রুত ডাক্তারকে ফোন করলো। ডাক্তার পুরো হাসপাতাল কাঁধে চাপিয়ে চলে এলো, বাঘের শরীরে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললো,
– আওয়ার সুপ্রিম লিডার, আপনার ব্লাড প্রেসার হাই। হার্টে ব্লক। মগজে ময়লা (গোবর বলার সাহস পেলো না) জমেছে।

বাঘ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললো,
– জঙ্গলের উন্নয়নের চিন্তা করতে করতে ঘুমোতে পারি না। জানো ডাক্তার, জঙ্গলের উন্নয়নের জন্য নিজেকে শেষ করে দিচ্ছি। এখন কি করতে হবে?

ডাক্তার কি না ডাক্তার, চিকিৎসার কথা তাকে বলতেই হবে। তাই সে বললো,
– আওয়ার সুপ্রিম লিডার, এক্কেবারে রেড মিট খাওয়া যাবে না। নো সুগার। কোলেস্টেরল ও ফ্যাটি খাবার নিষিদ্ধ। রাত জেগে জেগে নো হুইস্কি, নো ভদকা, হু। টেনশনও করা যাবে না।

“তেইলে কি আমি এনার্জি বিস্কুট আর মামপানি খায়া বাঁচুম” বলে বাঘ হুংকার দিতে যাচ্ছিলো, কিন্তু এর আগেই ডাক্তার কোমল স্বরে বললো, ‘আওয়ার সুপ্রিম লিডার, উত্তেজিত হবেন না, স্ট্রোক হতে পারে। হার্ট এটাক হতে পারে। কন্ট্রোল ইওরসেল্ফ।” ডাক্তারের কথা শুনে সম্মিলিত টিকটিকি ও রামছাগল জোটের নেতা-কর্মীরা দারুণ উত্তেজনায় দু’বার “সহমত ডাক্তার.. সহমত ডাক্তার.. লিডারের স্ট্রোক আর হার্ট এটাকের বিকল্প নাই.. লিডারের স্ট্রোক আর হার্ট এটাকের বিকল্প নাই” শ্লোগান দিলো এবং ভুল বুঝতে পারার সাথে সাথে দুই হাতে দুই কান ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।

‘কানে ধরার’ ব্যাপারটা দেখে বাঘের উত্তেজনা কিছুটা কমলো,
– ডাক্তার, তবে আমি খাবো কি?
– সুপ্রিম লিডার, আপনি ডায়েট করবেন। সকালে আর রাতে ওটস এন্ড মিল্ক। দুপুরে ভেজিটেবল স্যুপ।

বাঘের মন খুব খারাপ হলো, কিন্তু সুস্থ থাকতে হলে ডাক্তারের কথা মানতেই হবে। বাঘ বললো,
– খাওয়া না হয় ঠিক করলাম। টেনশন কমাবো কিভাবে?

ডাক্তার বললো,
– আওয়ার সুপ্রীম লিডার, আপনার বয়স হয়েছে, বিশ্রাম দরকার। অনেক তো হলো, এবার অন্য কাউকে দায়িত্ব দিয়ে বিশ্রাম নিন।

বাঘ মনে মনে ডাক্তারকে “বিএনপি-জামাত” বলে গাল দিয়ে প্রশ্ন করলো,
– দায়িত্ব তো দিতে চাই, কিন্তু কে নিবে! অন্য কাউকে দায়িত্ব দিবো কিভাবে? আমার ছেলে বা মেয়েকে দায়িত্ব দিলে এই জঙ্গলের বজ্জাতগুলো কি মেনে নিবে?

বাঘ ভেবেছিলো ডাক্তার বলবে “মানবে না কেনো, বজ্জাতগুলোর চৌদ্দ দু গুণে আটাশ গুষ্টি মানবে”, কিন্তু ডাক্তার সঙ্কোচ ও ভয়ে ভয়ে বললো,
– আওয়ার গ্রেট লিডার, আপনি টেনশন করবেন কেনো! একটা নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে অনুষ্ঠান হলে জঙ্গলবাসীরা ভোট দিয়ে নিজেদের নেতাকে বাছাই করে নিবে। যাকে বলে ডেমোক্রেটিক সিস্টেম।

ডাক্তারের কথার প্রতিবাদে বাঘ হুংকার দিলো,
– বজ্জাতগুলো সঠিক নেতাকে ভোট দিবে ভেবেছো! সঠিক নেতাকে ভোট দিলে কি দিনের নির্বাচন আমাকে রাতে করাতে হয়? এই জঙ্গলের উন্নয়নে আমি কি না করেছি, তুমিই বলো। আমার কি কোনো বিকল্প আছে?

“উন্নয়নের মাইনকা চিপায়, জনগণের বিঁচি হাঁপায়” বলতে গিয়েও ডাক্তার নিজেকে সামলে নিলো। তবে সম্মিলিত টিকটিকি ও রামছাগল জোটের নেতা-কর্মীরা কান ধরা অবস্থাতেই শ্লোগান দিলো, “সহমত লিডার, আপনার কোনো বিকল্প নাই। সহমত লিডার, আপনার কোনো বিকল্প নাই।”

ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে শিয়াল বললো, “আমাদের বিকল্পহীন বনরাজ থাকতে আবার ইলেকশন কিসের! তোমরা যারা ডাক্তারি করো তাদের বলছি, আমরা কি এমন চিকিৎসা চেয়েছিলাম!”

সম্মিলিত টিকটিকি ও রামছাগল জোটের শ্লোগান এবং স্যার শিয়ালের বক্তব্য বাঘের রাগ বা টেনশন কমাতে পারলো না। নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা শুনলেই এমনিতেই বাঘের টেনশন হয়। ভোটের মৌসুমে টেনশনের সাথে রাগ আর ভয়ও হয়। টেনশন হলে ব্লাডপ্রেশার বাড়ে; ব্লাড প্রেশার বাড়লে রাগ বাড়ে; রাগ বাড়লে আবার টেনশনও বাড়ে- অনেকটা নাইট্রোজেন চক্রের মত (দেখলে আমিও সায়েন্স জানি)।

বাঘের টেনশন বাড়ায় রাগও বাড়ছে.. বাড়ছে.. বাড়ছে। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাঘ একলাফে ডাক্তারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। ডাক্তারকে চেটেপুটে খাওয়ার পর বাঘের রাগ কমলো। রাগ কমায় টেনশন কমলো। টেনশন কমায় ব্লাড প্রেশার প্রায় স্বাভাবিক হলো। ডাক্তারের একটা হাড় শেয়ালের দিকে ছুড়ে দিয়ে বাঘ হাসতে হাসতে বললো,
– স্যার শিয়াল, আমার বয়স হয়েছে। আমি আর রাজা থাকবো না। তোমরা তোমাদের নতুন রাজা বেছে নাও, আমাকে মুক্তি দাও।

শিয়াল মনেমনে “শালার বাঘ, নতুন নেতা বাইছা নিতে গেলে তুই আমারে কি করবি তা কি বুঝি না! আমি কি মফিজ!” বললেও মুখে বললো,
– এমন কথা বইলো না লিডার। এমন কথা বললে উন্নয়ন পাপ দিবে।

বাঘ অবাক স্বরে প্রশ্ন করলো,
– উন্নয়নেও পাপ দেয়! তা উন্নয়নে কি পাপ দিবে?
শিয়াল এপ্লায়েড হিস্ট্রি বইয়ের পাতা উল্টে একটা পাতা বের করে বললো,
– কবি বলেছেন– উন্নয়নে দিলে পাপ
সবার আগে ভাগে বাপ।”

শিয়ালের কবিতা শুনে সম্মিলিত টিকটিকি ও রামছাগল জোটের নেতা-কর্মীরা বাঘের দিকে তাকাতেই বাঘ বললো,
– শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতেও ভাগবো না। এর আগে ভাগি নাই, চিকিৎসার জন্য এমাজনের জঙ্গলে গিয়েছিলাম।

সম্মিলিত টিকটিকি ও রামছাগল জোটের নেতা কর্মীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই শিয়াল আরেকটা পাতা খুলে উঁচু স্বরে আবৃত্তি করলো,
– হাতেনাতে পড়লে ধরা জনগণের ফান্দে
একটানেতে বিঁচি ছিড়ে ঝুলিয়ে দিবে কান্দে।

এমন পাপের কথা শোনার সাথে সাথে সম্মিলিত টিকটিকি ও রামছাগল জোটের নেতা-কর্মীরা কান ছেড়ে দুই হাতে ব্যক্তিগত ইউটিউবের সাবস্ক্রাইবার বেল-বাটন ঢেকে ফেললো। বাঘও নিজের লেজটা দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে ভিতরে গুটিয়ে নিলো, যেনো ওর বেল বাটন দেখা না যায়।

তারপর হলো কি, বাঘের নির্দেশে সবাই এখন কবিকে খুঁজছে। তোমাদের পরিচিতদের মধ্যে কেউ কবি থাকলে তাকে সাবধানে থাকতে বলবে। আর ডাক্তারের পরিবারের কাউকে চিনলে জানিয়ে দিবে যে ডাক্তার স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে আছে। ভাগ্যিস, আমরা জঙ্গলে থাকি না, আমাদের দেশের মত উন্নত দেশে এমনটা ভাবাও যায় না।

আজ এই পর্যন্তই, মনে রেখো- লোডশেডিং আছে বলেই এমন রূপকথা শুনতে পাচ্ছো, লোডশেডিং নিয়ে কোনো দুষ্টুমি করবে না, হু।

GD Star Rating
loading...
GD Star Rating
loading...
রূপকথাঃ এক যে বাঘ, 5.0 out of 5 based on 1 rating
এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের,লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

১টি মন্তব্য (লেখকের ০টি) | ১ জন মন্তব্যকারী

  1. মুরুব্বী : ২৫-১০-২০২২ | ২২:৩২ |

    অসংখ্য ধন্যবাদ মি. আবু সাঈদ আহমেদ। অসাধারণ এক রূপকথা পড়লাম। https://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_Yes.gif.gif

    GD Star Rating
    loading...

মন্তব্য করুন