index-1

সারারাত ঘুম আসেনি। ভোরের মসৃণ হাওয়া ঘরে ঢুকতেই মনের ভেতর এক ধরণের মায়া তৈরী হয়, আজও হলো। ভেন্টিলেটরে চড়ুই পাখির কিচিরমিচির, বাইরে দোয়েল পাখির শিস। গায়ে একটা কাঁথা জড়িয়ে নিলাম, শীত করছে। শ্বাসকষ্টটা ক্লান্ত হয়ে বিশ্রামে গেছে, ফের ঝাপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওর জানা নেই, যে মৃত্যুকে ভয় পায়না তাকে বেঁচে থাকার ভয় দেখাতে হয়, যে যন্ত্রণা উপভোগ করে তাকে সুখ দিয়ে বিব্রত করতে হয়। শ্বাসকষ্টের বোকামীর জন্যও মায়া হচ্ছে। চোখ বন্ধ করছি, ঘুম আসছে না, ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি জমাট বাঁধছে তন্দ্রার ঘোর।

বিশাল একটা ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছি আমি আর শুভময়। ঘরের দেয়ালগুলো দুধ সাদা, সিলিংয়ের রং সমুদ্রনীল। একপাশে বইয়ের আলমিরা, আলমিরায় হেলান দেওয়া দুটো গিটার। সিডি প্লেয়ারে সুজাত হুসাইন খানের কণ্ঠে ভর করেছে কবির দাস, সেতারের মখমল রিনিঝিনির সাথে সঙ্গত করে গাইছেন, ‘মোকো কাহা ঢুন্ড রে বান্দে, ম্যায় তো তেরি সাথ রে”, কণ্ঠে দরাজ দরদ নিয়ে গেয়ে যাচ্ছেন একের পর এক গজল, আলাপের ঢংয়ে। প্রায় দুপুর হয়ে এসেছে, গরম সাদা ভাত আর ঝাল খাসি ভুনা দিয়ে ভাত খাচ্ছি। শুভময় ওর সুখের কথা বলছে, কষ্টের কথা বলছে, দীপান্বিতার সাথে অভিমানের কথা বলছে। এর মাঝেই খুব মন দিয়ে খাচ্ছে, হঠাৎ ওর বামহাতটা আমার কপালে রেখে বললো,
– তোর আবার জ্বর এসছে।
– হয়তো।
– হয় তো না, সত্যিই।
– শুভময়, তুই ভাত খেয়ে নে।

শুভময়ের কণ্ঠে কোমলতা খেলা করে,
– তুই খাবি না!
– না, রে। আর খেতে ভালো লাগছে না। তুই খেয়ে নে শুভময়।
– খেয়েছি, আমি যাই। দরজাটা খুলে দে।

ওর জন্য দরজা খুলতে যাবো, শরীর ব্যাথায় কুকড়ে উঠলাম। চোখ খুলে বিভ্রান্ত, বিছানা জুড়ে রৌদ্র, ঘরে আমি একা। দরজা বন্ধ, শুভময় নেই। কি আশ্চর্য!

আবার ব্যাথা বাড়ছে, মাথার দু’পাশে দুই দিনমুজুর ইটের পরিবর্তে প্রতিটি শিরা উপশিরা আর পেশীগুলো ভাঙছে… ভাঙছে.. ভাঙছে। রাতের নির্জন সালামিনোস স্ট্রিট, দ্রুতগামী একটা গাড়ি মটর সাইকেলে ধাক্কা দিয়ে চলে গেলো, তাদের খুব তাড়া আছে হয়তো। পলকা কাগজের মত ছিটকে পড়লাম অনেকটা দূরে- উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পারলাম না, সেই কবেকার কথা, আজও স্পষ্ট।

স্মৃতির সিনেমোস্কোপে ঘুরছে রিল, এম্বুলেন্সের সাইরেন.. হাসপাতালে ডাক্তার ও নার্সদের ব্যস্ততা, চোখ খুলে রাখতে পারছি না। আবছায়া হয়ে হাসপাতালের সব মুখ। আবহ সঙ্গীতের মত শুধু বেজে চলেছে গ্রিকভাষী কারো ইংরেজি মন্তব্য “তেক মেন্তাল প্রিপারেশন, ইউ ক্যান নত সারভাইভ..তেক মেন্তাল প্রিপারেশন, ইউ ক্যান নত সারভাইভ… তেক মেন্তাল প্রিপারেশন, ইউ ক্যান নত সারভাইভ… “, তার বয়েসী গ্রীক মুখশ্রী.. ফর্সা মুখ জুড়ে দেবতা ক্রোনোসের মত শাদা দাড়ি.. তার উদ্বিগ্ন দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে.. চারপাশের সব শব্দ অস্পষ্ট হয়ে আসছে..বোধ তার সকল অহংকার নিয়ে সমর্পিত হচ্ছে বোধহীনতার কাছে। সমর্পনের মাঝখানে উঠে এলো বহুদিন আগের এক ছুটির দিন। বেইলি রোডের ব্যস্ততাশূন্য দুপুর। রোদ মেঘ আর হাওয়ায় মিলেমিশে একাকার বাইরে, সুইসের ভেতর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়া। ভিকারুননিসার কণ্ঠে আহ্লাদ,
– নটরডেম, তুমি একদিন নদী দেখাতে নিয়ে যাবে?
– তুমি যাবে?
– হ্যা, যাবো। বুড়িগঙ্গা নদী নয়, অন্য কোনো নদী..। আমার খুব নদী দেখতে ইচ্ছে করছে, তোমার সাথে নদী দেখতে না পেলে ঠিক ঠিক মরে যাবো।

নটরডেম পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকে ভিকারুননিসার চোখে, গাঢ় স্বরে বলে-
– আমার সাথে নদী দেখতে না পেলে মরে যাওয়াটা কাজের কথা নয়।
– জানিনা কিসের কথা, নদী দেখতে না পেলে আমি মরে যাবো, ঠিক ঠিক মরে যাবো।
– ভিকারুনিসা, এই একটা জীবনে আমাদের বহু মরে যাওয়া বাকী, যেখানে সেখানে মরে যাওয়াগুলো অপচয় করা ঠিক না।
বিভ্রান্ত চোখে তাকায় ভিকারুননিসা,
– তোমার কথা বুঝতে পারছি না।
নটরডেম কোনো উত্তর দেয় না, দুজনের গ্লাসে গলে আইসকিউব, কোক আরও শীতল হয়ে আসে। নিরবতা ভেঙে নটরডেম বলে,
– শঙ্খ নদী দেখতে যাবে? তুমি আর আমি।
– শঙ্খ নদী! কোথায় এই নদী!
– বহু দূর! দুপাশে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়, সবুজ যে কত রকমের হতে পারে, পাহাড়ের চূড়োয় কখনো বা মেঘ, আর পাহাড়ের পাদদেশে বয়ে চলা লক্ষ্মী এক নদী- শঙ্খ। তুমি সাঙ্গু নামেও ডাকতে পারো।
– ভীষণ সুন্দর, তাই না!
– হুম।

ভিকারুননিসা মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করে,
– ওই নদী কতদূর?
– বান্দরবান।
– ওহ! অনেক দূর?
– হুম।
– নটর ডেম, আমি তোমার হাত ধরে বসে থাকবো, সারাক্ষণ। নদীর তীরে- তোমার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাটবো। তুমি কিন্তু বকতে পারবে না।
– বকবো না।
– দেখো, একদিন ঠিক ঠিক যাবো, তোমার সাথেই যাবো।

নটর ডেমের স্বরে দীর্ঘশ্বাস আড়ালের চেষ্টা,
– ততদিন নদী যেনো ডুবে না যায়। ততদিন তুমিও না হারাও।
হেসে ওঠে ভিকারুননিসা,
– হি.. হি.. হি.. আমি হারাবো না। হি.. হি.. হি.. নদী আবার ডুবে না কি!
– নদী ডুববে না কেনো। নদীও ডুবে যায়। শেষতম ভ্রমণ শেষে উড়তে ভুলে যায় পাখি। প্রেম মরে যায়, জেগে থাকে চোরাটান।
– আর?
– বিচ্ছেদ দিগন্তে যায়, বিরহ তত দীর্ঘ নয়।

ভিকারুননিসা দাঁতে নোখ কাটে, নটর ডেমের হাতে হাত রাখে, স্বরে কৌতূহল,
– তোমার খুব মন খারাপ, নটর ডেম?
– নাহ, মন খারাপ না।
– তোমাকে ছাড়া জীবন অর্থহীন, তুমি আমাকে ছেড়ে যাবেনা তো!

নটর ডেম হেসে ওঠে,
– তুমি কি আমায় ছেড়ে যাবে, ভিকারুননিসা!

বেইলে রোডের ব্যস্ততাশূন্য ছুটির দুপুরে নেমে আসে কি অরণ্যের নির্জনতা! দু’জন দু’জনের চোখে খুঁজে যায় নির্ভরতা, অল্প বয়সের ভুল জানেনা কোনো নির্ভরতাই চিরস্থায়ী নয়। ঝাপসা হয়ে বেইলি রোড, শ্বাসকষ্ট বাড়ছে, মাথার ব্যাথা আরও তীব্র হচ্ছে। চোখ খুলতে ইচ্ছে করছে না। কপালে হাত রাখে শুভময়। জানতে ইচ্ছে করেনা এতক্ষণপর কোথা থেকে এলো, শুভময় বলে,
– তোর জ্বরটা কিন্তু বাড়ছে।
– বাড়ুক।
– কাউকে ডাকি?
– না, কাউকে ডাকতে হবেনা।

শুভময় সিডি প্লেয়ারের ভল্যুউম কমিয়ে দেয়, নিয়াজ মোহম্মদ চৌধুরী গাইছেন “তোমার যাবার সময় বুঝি হয়ে যায়/আমার দেবার কিছু বাকী রয়ে যায়/এভাবে চলে যাবে তুমি।” গান বাজছে, শুভময়ের চেহারাটা ভিকারুননিসার মত হয়ে আসে, অথবা এতক্ষণ সেই ছিলো ছদ্মবেশে, খুব করুণ স্বরে জিজ্ঞেস করে,
– নিজের প্রতি এত অবহেলা কেনো, তোমার?
– জানিনা।
– আমার ওপর রেগে কেনো নিজেকে কষ্ট দিচ্ছো নটর ডেম?
– আমি কারো ওপর রেগে নেই। নিজেকে কষ্টও দিচ্ছি না।
– দিচ্ছো তো!
– সে তোমার ভুল ধারণা, ভিকারুননিসা। আমার কাছে সবকিছু উপভোগ্য। এমন কি, তুমি যে চলে গেছো তাও আজ উপভোগ্য।
বাইরে একটা কাক ডাকছে, খুব কষ্ট করে মুহুর্তের জন্য চোখ মেলতেই দেখলাম ঘরে রোদ নেই, বাইরে কি বৃষ্টি হচ্ছে! অথবা চোখই মেলিনি, সব বিভ্রম। ভিকারুননিসা কথা বলে ওঠে,
– আমার চলে যাওয়া তোমার কাছে উপভোগ্য?
– হুম। তবে, তখন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিলো সবকিছু অর্থহীন, আমি যেনো এক আমূল ডুবে যাওয়া নদী, শেষতম ডানা ভাঙা পাখি।
– তারপর?
– তারপর বহুদিন পর, ছাই থেকে হয়ে উঠি ফিনিক্স পাখি, মনসুখিয়ার ডাকে।
– মনসুখিয়া কে?

নটর ডেম এ প্রশ্নের উত্তর দেয় না। বহুক্ষণ পর কানের কাছে কথা বলে ওঠে শুভময়, কষ্ট করে তাকাতে দেখি শুভময় নেই। শুভময়ের থাকার কথাও না, ষোলো বছর আগে যে মরে গেছে তার উপস্থিতি শুধুই বিভ্রম। তবু আজ হঠাৎ, বহুদিন পর, সারাদিন থেকে থেকে শুভময় ডাক দিয়ে যাচ্ছে। ভিকারুননিসা জানে, আমি তার নাম কেটে দিয়েছি বহু আগে, তবু কেনো বারবার সে আসে! মোবাইলের মেসেজ এলার্ট বেজে ওঠে, আঙুলের সকল ব্যাথা তুচ্ছ করে মোবাইল সেটটা হাতে নেই, মেসেজ খুলতেই মনের ভেতর ডেকে ওঠে রোদ্ররঙা ফিঙে, প্রিয় অভ্রবকুল লিখেছে, “ইশ! এভাবে কেউ অসুস্থ হয়! সুস্থ হয়ে ওঠো তারাতারি, কি মনসুখিয়ায় যাবে না!” অভ্রবকুল কি জানে সেই আমার মনসুখিয়া! কোনো প্রয়োজন নেই জানার, একটা জীবন কেটে যাক মৌলিক বিভ্রমে।

#মনসুখিয়া-২

VN:F [1.9.22_1171]
রেটিং করুন:
Rating: 5.0/5 (1 vote cast)
ঘোর, 5.0 out of 5 based on 1 rating
FavoriteLoadingলেখা প্রিয়তে নিন
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে অণুগল্প-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

২ Responses to ঘোর

  1. ফকির আবদুল মালেক বলেছেনঃ

    https://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_rose.gifhttps://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_heart.gif

    VN:F [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)
  2. মুরুব্বী বলেছেনঃ

    টাফ্ ইন্টারেস্টিং স্যার। অসামান্য লিখাটিতে একরাশ শুভ কামনা প্রিয়জন। https://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_rose.gif

    VN:F [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)

মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।