index-1

এমন বৈশাখ কে দেখেছে আগে! দুপুরে গরম প্রকট, রাতে বিপরীত। মফস্বল শহরের নদী সংলগ্ন এক পাড়ায় নির্জন দোতলার ছাদে দাঁড়াই, মাঝরাত, চারদিকে গাছের ফাঁকে ফাঁকে ঘুমন্ত বাড়িঘর। অল্প ক’টা বাড়ির বাইরে লাগানো বাল্ব থেকে আলোর বিচ্ছুরণ- নিস্তেজ, দুর্বল। জলরঙের কম্পোজিশনের মত আলো মিশে যাচ্ছে বৃহত্তর অন্ধকারে। চারদিকে নিভু নিভু সিগারেটের ধোঁয়ার মত ছোপ ছোপ কুয়াশা। নদীর সকল বিষাদ বাষ্পীভূত হয়ে মিশছে হাওয়ায়, তাই হাওয়া নৈরাশ্যের মত শীতল।

হঠাৎ একরাশ ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়, ছাদের টবে টবে লাগানো গাছের পাতারা খসখসিয়ে ওঠে। নিরাপদ খাঁচা হতে পোষা কবুতরগুলো ডেকে উঠে, দু’মিনিট পরই থেমে যায়। কে যেনো ক্যানকেনে স্বরে প্রশ্ন করলো,
– ওই লোকটাকে মনে আছে, মানুষ?
চোখ গেলো কিছুদিন আগে টিনের ড্রামে লাগানো পেঁপে গাছের পিছনে। ওখানে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকনাটা, ওই আবার জানতে চাইলো,
– ও মানুষ, ওই লোকটার কথা তোমার মনে আছে?
কৌতূহল গোপন করে খুব স্বাভাবিক স্বরে প্রশ্ন করলাম,
– কোন লোকটা?
– ওই যে পুরান ঢাকায়, বহু দিন আগে, তখন তোমার বয়স অনেক কম, তখন যে লোকটা আসতো ওই লোকটাকে মনে আছে?
অর্থহীন কথায় বেশ রাগ হয়, রাগটা ধীরে ধীরে কমেও যায়। কথা প্যাঁচালে রাগের সাথে যোগ হয় বিরক্তি, রাগ কমলেও বিরক্তি কমে না। বিরক্তি গোপন করলাম না,
– হয় স্পষ্ট করে বলো নয়তো এক্কেবারে চুপ থাকো। বিরক্ত করো না তো।
– বিরক্ত করছি না তো। ওই যে লোকটা মাঝরাতে আসতো, তার এক হাতে আমার মত টিনের ঢাকনা আর অন্য হাতে চিকন লাটি। লাটি দিয়ে হালকা করে ঢাকনায় ক’টা টোকা দিত, টিনের শব্দ থামলে সুর করে বলতো, “ওঠঠোওওও… জাগগোওওও.. রোজদারো.. ইনসানো ওঠঠোওওও। সেহরি খানেওয়ালা.. রোজা রাখনে ওয়ালা… নামাজ পড়নেওয়ালা.. যাকাত দেনেওয়ালাআআআ ওঠঠোওওও… জাগগোওওও…।”

২.
চোখের পলকে মফস্বলের ছাদটা রূপান্তরিত হয় পুরান ঢাকার এক বাড়ির ছাদে। ছাদের পূর্ব দিকে একটা মাত্র ঘর, মাঝরাতে ঘরের জানলা দিয়ে দক্ষিণ দিকের রাস্তায় তাকিয়ে আছে ক্লাশ এইট, অপেক্ষা করছে কখন আসবে ওই লোকটা। মোড়ে দাঁড়াবে, টিনের ঢাকনায় তিন চারটা বাড়ি দিবে, তাতে বিশ্রী আওয়াজ না হয়ে কেমন সুরেলা আওয়াজ হবে, যেনো বিলম্বিত দাদরা তালে বাজছে বাদ্যযন্ত্র, এরপর সুর করে বলবে, “ওঠঠোওওও.. রোজদারো.. ইনসানো…ওঠঠোওওও। সেহরি খানেওয়ালা.. রোজা রাখনে ওয়ালা… নামাজ পড়নেওয়ালা.. যাকাত দেনেওয়ালাআআআ ওঠঠোওওও… জাগগোওওও…।” এই লোকটা হেটে একটু সামনে যাবে, দাঁড়িয়ে টিন বাজাবে এবং সেহেরি খাওয়ার জন্য জাগার আহ্বান জানাবে, আবার সামনে যাবে। কতদূর সে যাবে জানা নেই।

লোকটার একটা চোখ অন্ধ, অবস্থাও দরিদ্র, অথচ কণ্ঠে হাহাকার নেই। সময় জুড়ে রোজা রাখার আহ্বানের কোমল তৃপ্তি ছড়িয়ে যেতে যেতে তার আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে আসবে। আর, তখনই স্পষ্ট শোনা যাবে নিচতলায় মা জেগে রান্নাঘরের দরজা খুলেছেন, ভাত রান্না করছেন। কিছুক্ষণ পর তরকারি গরম করবেন, হাওয়ায় ভাসবে সুবাস। আশপাশের বাড়ি থেকেও আসবে রান্নাঘরের শব্দ। খুব অল্প সময়ের মধ্যে জেগে উঠবে সবাই। বাড়ির ছাদে ছাদে বাচ্চারা রেলিং ধরে দাঁড়াবে, রাস্তায় টিউব লাইটের আলোয় কখন ফুটে উঠবে হ্যাজাকবাতির আলোর আভাসের তার অপেক্ষায়। এরপর হ্যাজাকের আলো সামনে এগিয়ে আসবে, সাথে কাসিদা দলের গান, “নীলাকাশে চাঁদ উঠেছে ওঠো মোমিন মুসলমান/রোজা রাখো নামাজ পড়ো আখেরাতে পাবে দান”, এই গানের শেষে শুরু হবে “হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়/সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে খুলে যায় —/সে যে আমার কমলিওয়ালা — কমলিওয়ালা।।”

এরই ফাঁকে মসজিদের মাইকে মুয়াজ্জিন ঘোষণা দিবেন, “প্রিয় রোজদার ভাই ও বোনেরা, সেহেরি খেয়ে নিন। সেহেরির সময় শেষ হতে আর এক ঘণ্টা বাকী।” টিনের ঢাকনায় আওয়াজ, কাসিদার গান, মুয়াজ্জিনের ঘোষণা- এসবে রাতের নির্জনতার ছন্দপতন ঘটবে না, এসব বাঙালির রমজানের মধ্য রাতের চিরায়ত অনুষঙ্গ।

ক্লাশ এইট নিচে নেমে আসতেই মা তরকারির বাটি হাতে দিয়ে বলবেন, “এটা শরফু দাদাকে আর এই বাটিটা ফুপুআম্মাকে দিয়ে আসো।” পাড়াতো দাদা, বয়স্ক মানুষ, অবস্থা স্বচ্ছল নয়। এমন আরও কিছু পরিবারকে মা, চাচী এবং প্রতিবেশীরা মিলে ঠিক করে নিতেন কবে কে তোফা পাঠাবেন। এই তোফাকে যেনো দান মনে না হয়, কেউ যেনো একক কৃতিত্ব দাবি করতে না পারে, তাই ওমন ব্যবস্থা। নীরবে প্রতিযোগিতাও চলতো, তোফা মানে উপহারের খাবারটা যেনো ভালো হয়, মাছ বা মাংসের টুকরোটা যেনো বড় হয়, আর রান্নাটা যেনো খুব স্বাদের হয়। ফুপু আম্মার বাসা থেকে আরেক বাটি তোফা নিয়ে ফিরতে হতো। পাড়াতো দাদাও তোফা দিতেন, দুটো খেজুর বা আম বা কলা জোড় করে ধরিয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, “খাইতে খাইতে বাড়িতে যাও, ভাই।”

ক্লাশ এইটের মনে পড়ে সুবীরদের কথা। সুবীরের মা মানে মাসিমা একবার মা’কে বলেছিলেন,
– আপা, আপনারা যে রাতে জেগে উঠেন, সেহরি খান, দেখতে খুব ভালো লাগে। খাবারের ঘ্রাণও খুব ভালো লাগে।
এমনিতে মা প্রায়ই খাবার পাঠাতেন, মাসিমা পাঠাতেন নারকেলের নাড়ু আর আনারসের চাটনি। মাঝে মাঝে নিরামিষ আর লুচি। তবু মা জানতে চাইলেন,
– তোমাকে সেহরি পাঠালে খাবে! ধর্মের বাঁধা নেই তো!
– না, আপা।
এরপর প্রায়ই মাসিমা’কে সেহরির সময় খাবার পৌছে দিতে হত। মা দুটো টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার গুছিয়ে দিতেন, অন্তত চারজন মানুষের তিনবেলা যেনো হয়ে যায়। ক্লাশ এইট জানতো তখন সুবীরদের খুব খারাপ দিন চলছে, এজন্যই মা সেহরির নামে তিন বেলার খাবারই পাঠাচ্ছেন। মাসিমা যেনো বিব্রত না হন তাই বলেছেন, সেহরি অল্প করে দেওয়ার রেওয়াজ নেই।

৩.
খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে ড্রামে লাগানো পেঁপে গাছের পাতা, বলে,
– তোমার এত কিছু মনে আছে, মানুষ?
এ কথায় ক্লাশ এইট ফিরে আসে মাঝ বয়সে, বলে,
– অনেক কিছুই মনে নেই।
– যেমন?
– ঘরে ফিরে দেখতাম মা শীতল পাটি বিছিয়েছেন। সবাই মিলে একসাথে সেহরি খেতে বসতাম। খাওয়ার ফাঁকে..
– খাওয়ার ফাঁকে কি?
– বাবা নিজের পাত থেকে মাংস বা মাছের টুকরো ভাইবোনদের পাতে তুলে দিতেন, একেক দিন একেক জনের পাতে।
পেঁপে গাছের পাতা খসখসে স্বরে বলে,
– এই যে মনে আছে!
– স্মৃতিটা মনে আছে সত্য, কিন্তু বহুদিন হয় বাবার গায়ের ঘ্রাণটা ভুলে গেছি।
– ওহ। তোমাকে কষ্ট দিলাম, মানুষ!
হাওয়ায় মিশে যায় দীর্ঘশ্বাস,
– না, কষ্ট নয়, বিষাদ। জানো, বাবা ডানহিল সিগারেট খেতেন।
– সিগারেট খাওয়া মোটেও ভালো কথা নয়, হু।
– ওই সময়ে কি আর এসব বুঝতাম! ডানহিলের গাঢ় লাল রঙের প্যাকেট, তাতে সোনালী বর্ডার- খুব প্রিয় ছিলো। প্যাকেটগুলো জমাতাম। যখন ক্লাশ এইটে, তখন বাবার ছোট্ট কারখানায় আগুন লাগলো। সব পুড়ে গেলো।
– তারপর!
– বাবা কেমন যেনো হয়ে গেলেন! ডানহিলের পরিবর্তে সস্তা স্টার সিগারেট খেতে শুরু করলেন। হাসি গেলো কমে, খেতে আর খাওয়াতে ভালবাসতেন। কষ্ট হলেও খাওয়ানোর রেওয়াজটা ধরে রাখলেন, কিন্তু খাওয়ার অভ্যাস অনেকটাই ত্যাগ করলেন।
হাওয়ায় দোল খায় পেঁপে পাতা, খাঁচার ভেতর বিষাদের মত ডেকে ওঠে এক জোড়া কবুতর,
– জানি… আমরা জানি.. আমাদের আগের জন্মের স্মৃতি.. আমাদের আগের জন্মের সব স্মৃতি..
– মানে?
– খুব সহজ, মানুষ। তোমার বাবা কিছুই বুঝতে দেননি কোথায় পুড়েছে কতটা। কে করেছে বিশ্বাসঘাতকতা আর কে লাগিয়েছে আগুন। নিজে পুড়েছেন প্রত্যহ।
– সত্যিই তাই।
– তিনি সবটাই নীরবে সয়েছেন, সবার চাওয়া পূরণ করেছেন সাধ্যমত। কারো প্রতি ছিলো না অভিযোগ।
– হ্যা।
একটা কবুতর প্রশ্ন করে,
– আমাদের এই জন্মে তুমিও কি ক্রমশ তোমার বাবার মত হয়ে উঠছো, মানুষ?
– কি জানি, জানিনা তো।
– তোমারও দেখি কি নিজের জন্য সময় নেই?

এসব প্রশ্নের উত্তর হয় না, উত্তর জানাও নেই। খোলা ছাদে মাঝ বয়সের মানুষটা আবার ফিরে যায় ক্লাশ এইটে। সেহরি খাওয়ার পর সবাই মিলে চা খাওয়া হচ্ছে। বাবা বহু দিন আগের ওই ছাদে প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে নাড়াচাড়া করছেন, কিন্তু ধরাচ্ছেন না। ক্লাশ এইট জানে চা’য়ে শেষ চুমুক দিয়ে বাবা সিগারেটটা প্যাকেটে ভরে রেখে দিবেন, এই মাসটায় চেন স্মোকার বাবা সিগারেটে একটা টানও দিবেন না।

সেহরির সময় শেষ হয়ে আসে। মুয়াজ্জিন জানান, “আর মাত্র পনেরো মিনিট বাকী, সেহরি খাওয়ার সময় শেষ হতে আর মাত্র পনেরো মিনিট বাকী।” কাসিদার গান আবার ক্ষীণ থেকে স্পষ্ট হয়ে আসে। এবার তারা ফিরতি পথে যাচ্ছে, দলের মধ্যে সবচাইতে সুরেলা কণ্ঠ যার, সে আকুল হয়ে গায়, “এই সুন্দর ফুল সুন্দর ফল/মিঠা নদীর পানি…” বাকীরা পরের লাইনে কোরাস ধরে, “খোদা..তোমার মেহেরবানী/খোদা..তোমার মেহেরবানী।”

সেহরির সময় শেষ হওয়ার পর মসজিদের অল্পবয়সী মুয়াজ্জিন পৃথিবীর সকল প্রেম কণ্ঠে ধারণ করে গাইতে শুরু করে,
“খোদার প্রেমের শরাব পিয়ে বেহুঁশ হয়ে রই প’ড়ে
ছেড়ে’ মস্‌জিদ আমার মুর্শিদ এল যে এই পথ ধ’রে।।
দুনিয়াদারির শেষে আমার নামাজ রোজার বদ্‌লাতে
চাইনে বেহেশ্‌ত্‌ খোদার কাছে নিত্য মোনাজাত ক’রে।।”

মহল্লায় একটা সতেজ আলস্য নেমে আসে, কেউই যেনো নামাজ রোজার পুরস্কার স্বরূপ বেহশত চায় না, পরম করুণাময়ের প্রেমে বেহুশ হয়ে থাকাতেই সবার পরমানন্দ। মুয়াজ্জিনের গান থেমে যায়, আবেশ থাকে অনেকটা সময়, এরপর আজান, খাইরুন মিনান নাউম.. খাইরুন মিনান নাউম…। একটা নতুন দিনের শুরু।

৪.
প্রতিদিন সকালে নিকোলাস স্যারের কাছে ক্লাশ এইটের কোচিং থাকে। পুরান ঢাকার লক্ষ্মী বাজারের এক গলির ভেতর কোচিং সেন্টার। ওই বাড়ির মালিক ছিলেন সংগীত বিশারদ সমর দাস। ক্লাশ এইট সময়ের আগেই কোচিংয়ে পৌছাতো, বাড়ির ভেতর থেকে গ্রান্ড পিয়ানোতে ভেসে আসতো মনভুলানো সুর। প্রায়ই পিয়ানো বাজিয়ে কেউ গাইতো, “আ..নন্দলোওওওকে মঙ্গলালোওকে বিরাজও..ও..ও সত্য সুন্দরও…।”

কোচিংয়ে পালা করে প্রথম ক্লাশ নিতেন হাকিম স্যার আর অর্জুন স্যার। অর্জুন স্যার ক্লাশে ঢুকেই বলতেন,
– কারা কারা রোজা আছো হাত তুলো।
যারা হাত তুলতো তাদের দুই পিরিয়ড পর ছুটি দিয়ে বলতেন,
– সোজা বাসায় চইলা যাইবা। এবাদতের ফাঁকে পড়া শেষ করবা।

হাকিম স্যার বেশী সময় ধরে ক্লাশ নিতেন। কেউ উশখুশ করলে বলতেন, বেশীক্ষণ ক্লাশ করলে তোমাগো ক্ষিধায় ধরবো না। আরামে রোজা করতে পারবা। অর্জুন স্যার আগে ছুটি দিলে ক্লাশ এইট একা একাই ঘুরে বেড়ায়, রাস্তার দুইপাশে দেখার কতকিছু। মাঝে মাঝে সদরঘাটের লিয়াকত এভিনিউর দোকানগুলো থেকে গল্পের বই ভাড়া নিয়ে বাসায় ফিরে। বই পড়ার মাঝেই বাড়ির প্রয়োজনে বাজারে আর মসজিদে নামাজ আদায় করতে যাওয়া হয়। ফিরে আবার বইয়ে ডুব।

আসরের নামাজ আদায় করেই মা ব্যস্ত হন ইফতার তৈরী করতে। রমজান মাসে তার উপর খুব চাপ যায়। প্রতিদিনই দুই তিনজন প্রতিবেশীকে ইফতার পাঠানো হয়। মা’র ক্লান্তি নেই। রোজা রেখেও এ মাসে অন্তত দু’দিন নির্ঘুম কাজ করতে হবে তাকে, একদিন সকল প্রতিবেশীর বাড়িতে ইফতার যাবে, অন্যদিন মসজিদের ইমাম ও মুসুল্লিদের জন্য। এত কাজের পরও মা’র চেহারায় খেলা করে অপার সুখ ও তৃপ্তির আভা। ক্লাশ এইট বইয়ে মগ্ন হয়ে থাকে, মাঝে মাঝে রান্নাঘরে মায়ের আশপাশ দিয়ে ঘুরে আসে। মায়ের ঘ্রাণ নিতে ভালো লাগে, মায়ের ঘ্রাণ মন ভরে নিলেও রোজা ভাঙেনা।

সময় গড়ায়। ক্লাশ এইটের ঘোর ভাঙে আসরের নামাজের বহু পরে, নাসির চাচার সুরেলা চিৎকারে, “এইইইইই পাহাইড়া বরফ…. এইইইইই পাহাইড়া বরফ…এইইইই…।” কাঠের কুড়ো দিয়ে ঢাকা বরফের পাটা, গাঢ় খয়েরি রঙয়ের কাঠের কুড়োর দুই একটা ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে দুধ সাদা বরফ। কি যে সুন্দর! ঘরে ফ্রিজ আছে, এরপরও পাহাইড়া বরফ কেনা চাই। ক্লাশ এইট জানে এ বরফের জন্ম কোনো এক কারাখানায়, এ বরফ পাহাড় থেকে আসা নয়। তবু ভাবতে ইচ্ছে করে, বহুদূরের কোনো পাহাড় থেকে কেউ একজন বরফগুলো নিয়ে এনেছে, শুধু পানি নয়, গলে যেতে হবে জেনেও পানির সাথে পাহাড়ের সহস্র স্মৃতি জমাট বেঁধে জন্ম নিয়েছে এ বরফ, শীতল শুভ্র বরফ।

মফস্বলে রাত গভীর হয় দ্রুত। খোলা ছাদে স্মৃতিকাতর মাঝবয়সী মানুষের ভাবনায় সুর মিলায় রাতের হাওয়া, ফিসফিসিয়ে বলে,
– আমি সেই পাহাড়ের কথা জানি, মানুষ। আমি সেই পাহাড়টা চিনি।
– তাই! কোথায় সেই পাহাড়?
– বহুদূর। বহু… বহু… দূর।
মানুষ উদগ্রীব হয়ে জানতে চায়,
– আমাকে ওই পাহাড়ের কাছে নিয়ে যাবে, প্রিয় হাওয়া?
হাওয়ার স্বর করুণ হয়ে আসে,
– ওই পাহাড় ডাক পাঠালে তবেই যাওয়া যায়, এর আগে নয়।
– ও তুমি মনসুখিয়ার চিরশুভ্র চিরশীতল পাহাড়ের কথা বলছো!
– হ্যা, মানুষ। আমি ওই পাহাড়ের কথাই বলছি। আমি ওখান থেকেই মাঝে মাঝে আসি, তোমায় দেখি, আবার ফিরে যাই।
মানুষের মুখে হাসি ফুটে ওঠে,
– প্রিয় হাওয়া, তুমি মনসুখিয়ার পাহাড়কে বোলো, সে যেনো ডাকে আমায়। তাকে আরও বোলো জমাটবাধা বরফ যেমন উত্তাপে গলে যায়, আমিও প্রতিনিয়ত গলে যাচ্ছি, দ্রুত.. খুব দ্রুত।
হাওয়া কিছুই বলে না। পেঁপে গাছের পাতা, তেলের ড্রামের ঢাকনা, খাঁচার ভিতর কবুতরগুলো নিরব হয়ে থাকে, শুধু রাতের একটা তারা জিজ্ঞেস করে, “তোমাকে এত দ্রুত গলতেই হবে, এ তোমার কেমন নেশা মানুষ!” উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না, যে গলে যাচ্ছে তার কাছে এসব প্রশ্ন ও উত্তরের কোনো অর্থ নেই।

VN:F [1.9.22_1171]
রেটিং করুন:
Rating: 5.0/5 (1 vote cast)
রোজা আফজা, 5.0 out of 5 based on 1 rating
FavoriteLoadingলেখা প্রিয়তে নিন
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে গল্প-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

১ Response to রোজা আফজা

  1. মুরুব্বী বলেছেনঃ

    আবেশময় গল্প উপহার। পড়তে পড়তে এক অসাধারণ মগ্নতা চলে আসে। শুভেচ্ছা https://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_good.gif

    VN:F [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)

মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।