rabi

বাঙালিরা স্বভাবগতভাবে একজনরে ছোটো না কইরা অন্যজনরে বড় করবার পারে না, আর বাঙালি ব্যবসাও বোঝেনা- এই দুইটা কথাই সইত্য। তা না হইলে আজ সারা দুনিয়ায় ছড়াইয়া যাওয়া ‘একজনরে ছোটো বানাইয়া অন্য জনরে বড় প্রমাণ’এর অভ্যাসটার কপিরাইট দাবী কইরা বহুত ফরেন কারেন্সি আদায় করা যাইতো। এইটা বারবার মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাজী নজরুল ইসলামের অন্ধ ভক্তদের আচরণ দেইখা।

রুই মাছের স্বাদ বেশী না বোয়াল মাছের- এই তুলনা অবান্তর, কারণ দুইটা মাছ হইলেও তাগো মধ্যে তুলনা চলেনা। ফল হইলেও জাম্বুরার লগে নারিকেলের তুলনা চলেনা। পাখি হইলেও কোকিলের লগে ঈগলের তুলনা বেমানান। কারণ, তারা নিজ নিজ স্বাদে ও গুণে ইউনিক। সাহিত্যিক হইলেও রবীন্দ্রনাথের লগে নজরুলের বা নজরুলের লগে রবীন্দ্রনাথের তুলনা চলেনা, তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দুই জনের বয়সের ফারাক প্রায় ৩৮বচ্ছর, এরপরও দুইজনের সম্পর্কটা মুখামুখির আছিলো না, আছিলো পাশাপাশির।

বড় সাহিত্যিক গো সাট্টিফিকেট পাওয়ার লেগা এইকালে যেমুন অনেক লেখক গোপনে বা প্রকাশ্যে চেষ্টাচরিত্ত করে, ওই কালেও করতো। ওই কালের সবচে বড় সাহিত্যিক হইলেন রবীন্দ্রনাথ, নোবেল প্রাইজ পাইছেন, সারা দুনিয়ায় তার পরিচিতি। তার কাছ থেকা একটা সার্ট্টিফিকেট পাইলে আর লাগে কি! রবীন্দ্রনাথের কাছে লেখা বহুত চিঠিতে এই সার্ট্টিফিকেটের আবদারের প্রমাণ আছে। মাগার কাজী নজরুলরে রবীন্দ্রনাথ এমন এক সার্ট্টিফিকেট দিলেন যে, ওই সময়েই অনেকের কলিজা ফাইট্টা খানখান হইয়া গেলো। নিজের লেখা ‘বসন্ত’ গীতি নাট্য উৎসর্গ কইরা দিলেন কারাবন্দী কাজী নজরুলরে, প্রায় ৬৪ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ ২৪বছর বয়সী নজরুলরে সম্বোধন করলেন কবি বইলা, উৎসর্গে লিখলেন, ‘শ্রীমান কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্নেহভাজনেষু’।

খালি উৎসর্গ করলেও একটা কথা আছিলো, তাগো দু:খ আরও বাড়ায়া দিতে বসন্ত’র একটি কপিতে নিজের নাম স্বাক্ষর কইরা পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে দিয়া রবীন্দ্রনাথ কইলেন, ‘‘তাকে (নজরুল) বোলো, আমি নিজের হাতে তাকে দিতে পারলাম না বলে সে যেন দুঃখ না করে। আমি তাকে আমার সমগ্র অন্তর দিয়ে অকুণ্ঠ আশীর্বাদ জানাচ্ছি। আর বোলো, কবিতা লেখা যেন কোনো কারণেই সে বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে, কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা জাগাবার কবিও তো চাই।’

রবীন্দ্রনাথের এই ‘বসন্ত’ কাণ্ডে অনেকের কলিজায় গুঁটি বসন্তের জ্বালা শুরু হইলো। তাগো মতে কাজী নজরুলের মতন অপগণ্ড, নিম্নমানের কবিরে বিশ্বকবি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ কবি বইলা সম্বোধন করবেন, স্বীকৃতি দিবেন, এইটা মাইনা নেওয়া যায় না। এই বিশেষজ্ঞদের মোক্ষম জবাব দিলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘নজরুলকে আমি গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গপত্রে তাকে ‘কবি’ বলে অভিহিত করেছি। জানি, তোমাদের মধ্যে যারা এটা অনুমোদন করতে পারেনি, আমার বিশ্বাস তারা নজরুলের কবিতা না পড়েই এ মনোভাব পোষণ করেছে। আজ আমি যদি তরুণ হতাম তাহলে আমার কলমেও ওই সুর থাকত।’ আবার অনশন ভাঙার অনুরোধ কইরা নজরুলরে টেলিগ্রামে লিখলেন, ‘Give up your hunger strike, Our literature claims you’ , এইখানে হাঙ্গার স্ট্রাইক ভাঙার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হইলো- ওরে নজরুল, আমাগো সাহিত্যে তোমারে দরকার।

নজরুলও কিন্তু রবীন্দ্রনাথরে ‘সঞ্চিতা’ উৎসর্গ করছিলেন, সেটা রবীন্দ্রনাথের নজরুলরে ‘বসন্ত’ উৎসর্গের প্রায় আট বচ্ছর পর।

রবীন্দ্রনাথের লগে নজরুলের কথাবার্তা হয় ১৯২১সালে, শান্তি নিকেতনে। এই দুইজনের যোগাযোগের মধ্যিখানে ছিলেন আরেক জ্ঞাণী মানুষ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ষাট, নজরুলের মাত্র একুশ। এর এক বচ্ছর পর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের স্মরণ সভায় সভাপতিত্ব করেন রবীন্দ্রনাথ, নিজের পাশে বসান নজরুলরে। আর যায় কই, লগে লগে জ্ঞানী দর্শক আর মাঝারি ও বাচ্চা সাইজের অতি রবীন্দ্রনাথরা চেইতা উঠলো- রবীন্দ্রনাথের লগে একই মঞ্চে পাশাপাশি বয় নজরুল! রবীন্দ্রনাথ ক্যান আশকারা দিয়া নজরুলের মতন এক ফাঁপা সাহিত্যিকরে ঘাড়ে তুলতাছেন, সে পালায়া যাইতে চাইলেও তারে ডাইকা মঞ্চে তুইলা নিজের পাশে বসাইতাছেন- এই অনাচার তো মানাও যায়না, রবীন্দ্রনাথরে কিছু কওনও যায় না। ধূমকেতুর ম্যানেজার শান্তিপদ সিংহ এই পরিস্থিতিরে কলমে ধইরা রাখছেন এভাবে , ‘বিশ্বকবি মঞ্চে প্রবেশ করলেন এবং প্রায় পিছু পিছু কবি নজরুলও একেবারে মঞ্চের উপর। কবি গুরুর ইঙ্গিতে তাঁর পাশের আসনেই বসলেন। নিচে সেই গুনগুনানি। তাদের হিসাব মতে, কবি গুরুর পাশে বসবার যোগ্যতা নজরুলের নেই। অথচ ঘটনাচক্রে তিনি রবীন্দ্রনাথের পাশে বসবার সুযোগ পাচ্ছেন বড় বড় সভায়। কি দুর্দৈব!’

রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাস লইয়া সিনেমা বানানো হইবো, পরিচালক নরেশ মিত্র ‘গোরা’ সিনেমার সংগীত পরিচালক হিসাবে চাইলেন নজরুলরে, নজরুলও রাজী হইলেন। মনে রাখতে হইবো নজরুল তখন শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয় জনপ্রিয় গীতিকার ও সুরকার। সিনেমাতো বানানো হইলো, মাগার, গোরা সিনেমার মুক্তি আটকায়া গেলো বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের আপত্তিতে। বোর্ড আপত্তি করলো দুই কারণে, একে তো বোর্ডের অনুমতি না নিয়া রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহার করা হইছে, তার ওপর সুরও ঠিক নাই। সিনেমার প্রযোজক পরিচালকের মাথায় হাত, ভাড়া করা ট্যাক্সিতে নজরুল ফিল্মের প্রিন্ট আর প্রজেক্টর লয়া ছুটলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। ঘটনা শুইনা রবীন্দ্রনাথ ঠাসকি খাইলেন, অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করতে করতে নজরুলরে কইলেন, ‘কী কাণ্ড বলো তো? তুমি শিখিয়েছ আমার গান, আর ওরা কোন আক্কেলে তোমার দোষ ধরে? তোমার চেয়েও আমার গান কি তারা বেশি বুঝবে? আমার গানের মর্যাদা কি ওরা বেশি দিতে পারবে?’

নজরুল আছিলেন গান আর কবিতা পাগল মজলিশি মানুষ। একবার নজরুলের নেতৃত্বে গানের মহড়া চলতাছে, এক পত্রিকার সম্পাদক আইসা গান চায়া রবীন্দ্রনাথরে ছোটো কইরা নজরুলরে বড় করতাছিলেন, যে স্বভাবের কথা লেখার শুরুতেই কইছি। মাগার নজরুলরে তো পাম দিয়া ফুলানো যায় না, তিনি ওই সম্পাদকরে ধমকায়া কইলেন, ‘আমরা যদি কেউ না জন্মাতাম, তাতে কোনো ক্ষতি হতো না, রবীন্দ্রনাথের গান বেদমন্ত্র, তাঁর গান ও কবিতা আমাদের সাত রাজার ধন মানিক। লেখা নিতে এসেছেন, নিয়ে যান, লেখা নিতে এসে এ রকম আমড়াগাছি যেন আর না শুনি।’

রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের এমন চমৎকার সম্পর্কটার মধ্যেও শেষ পর্যন্ত বামহাত ঢুকাইতে সক্ষম হইছিলো একদল লোক, তাগো মুখামুখি দাঁড় করাইতে পারছিলো ওই বদগুলা, আফসোস। ওই সাময়িক ভুল বুঝাবুঝির পরও দুইজনের প্রতি দুইজনের দিলে মোহব্বতের কমতি আছিলো না। ওই কথা আরেকদিন কমুনে, আজ এই পর্যন্তই।

শুভ জন্মদিন প্রিয় কাজী নজরুল ইসলাম।

VN:F [1.9.22_1171]
রেটিং করুন:
Rating: 5.0/5 (1 vote cast)
অপ্রমিত অর্বাচীনের বাখোয়াজ: রবি ও নজরুল সম্পর্ক, 5.0 out of 5 based on 1 rating
FavoriteLoadingলেখা প্রিয়তে নিন
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

৩ Responses to অপ্রমিত অর্বাচীনের বাখোয়াজ: রবি ও নজরুল সম্পর্ক

  1. মুরুব্বী বলেছেনঃ

    রুই মাছের স্বাদ বেশী না বোয়াল মাছের- এই তুলনা অবান্তর, কারণ দুইটা মাছ হইলেও তাগো মধ্যে তুলনা চলেনা। ফল হইলেও জাম্বুরার লগে নারিকেলের তুলনা চলেনা। পাখি হইলেও কোকিলের লগে ঈগলের তুলনা বেমানান। কারণ, তারা নিজ নিজ স্বাদে ও গুণে ইউনিক। সাহিত্যিক হইলেও রবীন্দ্রনাথের লগে নজরুলের বা নজরুলের লগে রবীন্দ্রনাথের তুলনা চলেনা, তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। শুভ জন্মদিন প্রিয় কবি। https://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_rose.gif

    VN:F [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)
  2. ফয়জুল মহী বলেছেনঃ

    Respect 

    VN:F [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)
  3. ফকির আবদুল মালেক বলেছেনঃ

    https://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_Yes.gif.gif

    VN:F [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)

মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।