চালচোর

ভোর সকালে দক্ষিণ ঘরের একপাল্লা দরজা ঠেলেই চোখ-মুখ কুঞ্চিত করে সুলতান। ছেলে এত সকালে গেল কোথায়? এখন তো সব বন্ধ। খন্দকারের লেদ কারখানাও। আজও কি তবে রিলিফের জন্য গেছে? সে সামনে এসে জিজ্ঞেস করে, –
‘মিরনের মা, ব্যাটা কি রিলিপ আইনবার গেইচে? ঘরোত্‌ নাই।’
জামিলা তখন উনুন ধরায়। হাতের ডানদিকে একগাদা কার্টন ছেঁড়া কাগজ। বাঁশের কতগুলো টুকরো। এসব দিয়েই কখনো রান্নার কাজ চলে। সে চারপাশে ধোঁয়ার মধ্য থেকে পিটপিট তাকায়। বাঁশের টুকরোগুলো ভেজা। এখনো জ্বালাতে পারেনি। একপাশে গামলায় আটা আর রুটি তৈরির পিড়া-বেলনা। উৎসুক দৃষ্টিতে কোনো কথা নেই। সুলতানের কথা কানে গেছে কি না বোঝা যায় না। আজকাল অবশ্য মুখে খই ফোটে না তার। তাই হয়তো মুখ নামিয়ে কাজে মন দেয়। ফু-ফু করে ফুক মারে উনুনে। সুলতান ধরে নেয়, মিরন রিলিফ আনতে গেছে। তার বিমর্ষ মন। সংসারে কোনোকিছু দিতে পারে না বলে গুরুত্ব বোধকরি কমে গেছে। সে না থাক। মিরন গেল কোথায়? এদিকে ক্ষুধা পুনরায় খুব জোর মাথা চাড়া দিতে শুরু করে। কী খাবে? খাওয়ার কিছু নেই। দিন কয়েক আগে সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে কোমরব্যথা। খবরের কাগজ নিয়ে বাড়ি-বাড়ি যাওয়া হয় না। আজ যেন অবসরপ্রাপ্ত হকার। সেদিন রুবেল মিয়া খোঁজ নিতে এসে বলে, –
‘মিয়া সংবাদপত্র তো বন্ধ হয়নি। তুমি ঘরে বইসা আছো? পেপার দিব কেডায়?’
‘কী করুম? চার্জার রিকশাঅলা এমন ধাক্কা দিছে, পইড়া গেলাম। এ্যালায়ও কোমর ঠিক হয় নাই।’
‘ও আইচ্ছা, ঠিক হইলে কামে আইস। তবে সাবধানে থাইকো মিয়া। করোনা আইছে। খুব খারাপ ব্যামো। অষুধ নাই। চিকিৎসা নাই। দেশে দেশে হাজার হাজার মানুষ সাবাড় হইতাছে।’
‘এইটা ফির কী অসুখ?’
‘ভাইরাস…ভাইরাস।’
সেই থেকে আজ প্রায় একুশ-বাইশ দিন চলে যায়। খাওয়া-না-খাওয়া দিনরাত। পেটে দানাপানি তেমন নেই। জামিলা দুইবেলা রুটি তৈরি করে। সকাল আর রাত। দুপুরে উপোষ। বুড়ো শরীর কিছুতেই মানে না। গতকাল দুপুরের আগে আগে কয়েকটি শিঙাড়া হাতে করে আনে মিরন। রিলিফ আনতে গিয়েছিল। সুলতান তখন থেকেই স্বপ্ন দেখে, দুইদিন ভাত খায় না; আজ ভাত খাবে। জামিলার হাতে মসুর ডালভরতা বেশ স্বাদের হয়। উনুনের পাশে দেয়ালে ঝোলানো তাকে কাচামরিচ দেখেছে। একটু ঝাল বেশি দিলেই হয়। সেই স্বপ্ন শিঙাড়া মুখে দিতে দিতে দপ করে নিভে গেল। মিরন রিলিফ পায়নি। আশপাশের মানুষজন একটি-দুটি করে লাল-সাদা ডোরাকাটা দাগের ব্যাগ পেল। পাঁচ কিলো চাল। সেই চালও বেশ ভালো। ব্যাগে আরও আছে মসুর-তেল-মরিচ-পেঁয়াজ-লবণ আর কী কী? কেউ কেউ টাকাও পেয়েছে শোনা যায়। মিরন খালি হাতে এসে বলে, –
‘রিলিপ পাওয়া যায়নি বা। আগত্‌ কার্ড নেওয়া নাগবে। মোর কার্ড নাই। তাই লাইন থাকি ঘুরি আয়নো।’
‘কাড ফির কাঁয় দিবি?’
‘চেয়ারম্যান-মেম্বারের ঠে নিবা হবি নাকি। কিছু খায়া ও-বেলাত যাইম এ্যালা।’
‘সাঁঝের আগোত ফির আসিবা হবি বা।’
‘হয় হয়।…রিলিপ দিবি না চুরি করিবি? সরকার চাল দেছে, আর ওমরাহ ঘরোত তুলি রাখোচে।’
‘কাঁয় কী করে বা তোক দেখা নাগিবি না। কুনো কাথা কবু না।’
‘হয়।’
জামিলা মানুষের বাড়ি কাজ করে। সেই কাজ বন্ধ। ভাইরাস শেষ হলে যেতে বলেছে। তার আগে নয়। সেই বাড়ি থেকে পাওয়া কয়েক কেজি আটা রুটি বানিয়ে খাওয়া চলে। মিরন তার সকালের ভাগের দু-খানা রুটি খেয়ে বের হয়। বিকেলে এসে দাঁড়ালে তার খুশি চোখ-মুখ দেখে অনেককিছু বুঝে নেয় সুলতান। ছেলে দেখতে দেখতে সতেরোয় পা দিল। কাজ গুছিয়ে নিতে জানে। সুলতান ছেলের বুকচাপা আনন্দ দেখে নিজের সেই বয়স খুঁজে পায়। সেই চোখ সেই নাক আর নিচে হালকা গোঁফ। গলার স্বরেও যেনবা যুবক সুলতান। ছেলে তার গর্ব। কলিজার টুকরা। তার মতোই দায়িত্বশীল। অন্ধের যষ্টি। বুড়োকালের ভরসা। দেওয়ান খন্দকারের লেদ মেশিনে কাজ শেখার জন্য ঢুকিয়ে দিয়েছিল। শিখতে শিখতে কেটে গেল চার-পাঁচ বছর। এখন বেতন পায়। মাস শেষে আড়াই হাজার টাকা অনেক শক্তি। সুলতানের অহংকার। একদিন ছেলে নিজের দোকান দেবে। সেই দোকানের এককোনায় বসে বসে খবরের কাগজ পড়বে সুলতান। এতদিন খবরের কাগজ হকারি করল…তার খবর নেয় কে?
‘কাড পালু বা?’
‘হয়। কাল নহায় মঙ্গলবার রিলিপ পামো। খন্দকার চাচার ঠে কিছু টাকা চানু। কাল দিবা চাইলে।’
‘আল্লাহ ভরসা বা। তুই এতি-উতি বেশি বেড়াই না। কী-বা কয় কোরনা না ভাইরাক্স আইছে। খুবে সাবধান।’
‘মুই তো মাক্স পরি যাও। বারবার হাত ধোও। সবার হাত ধুবা হবি। তুইও বা বাইরাবু না। তোর তো ফির মাক্স নাই।’
‘মোর যা কোমরের বিষ। ক্যাংকরি যাইম? ’
‘তোর বাপর তনে কটা ট্যাবলেট আনি দিস বা মিরন।’
‘কাইল খন্দকার চাচা টাকা দিলি তো।’
জামিলা আরও একটি রুটি তুলে দেয় পাতে। যোয়ান ছেলে পেটভরা না খেলে শক্তি পাবে কোথায়? কাজ করবে কীভাবে? সে তো মা। ছেলের খাওয়াই তার শান্তি। তারপর মিরন অনেক দূর থেকে এসেছে। মেম্বারের বাড়ি কি এখানে? জামিলা জানে, মিরন সকাল সকাল রিলিফ নিতে যাবে। জামিলা আজ ভাত রাধবে। রুটি খেতে খেতে আর ভালো লাগে না। কবে যে সবকিছু আবার খুলবে কে জানে। মন বড় অস্থির হয়ে থাকে। কাকে কী বলে। সে আটার মণ্ড ডলে। টুকোর টুকরো ভাগ। ছয়খানা রুটি।

সকাল হতে হতে সূর্য অনেকখানি উঠে যায়। জামিলার রুটি শেঁকাও শেষ। সুলতান সবে গরম রুটির প্রান্তে কামড় বসিয়েছে, আকস্মিক মন উদাস হয়ে গেল। মিরন থাকলে খেয়ে নিত। কখন রিলিফ পাবে আর কখন খাওয়া। সুলতানের বুড়ো শরীর। কোমরে আঘাত আর ব্যথা। চলতে-ফিরতে ভালোই কষ্ট হয়। পিঠের ডানপাশে টান পড়ে। তারপরও একটু বের হবে। কোথায় রিলিফ দিচ্ছে? ইউনিয়ন পরিষদ না কি মেম্বারের বাড়ি? সে দেখেশুনে যেতে চায়। তার মাস্ক নেই। কী করা যায়? মুখে গামছা বেঁধে নেওয়া যায়। রুটির শেষ টুকরো মুখে পুরে স্বগতোক্তি নাকি জিজ্ঞাসা ছুড়ে দেয় সে।
‘মিরন কয়া গেল না? সেখন মঙ্গলবার শননু, তো ফির আইজ দিবি? মোক কলি মুইহো যাবা পারনু হয়।’
‘মিরন মিরন…আয় বা, গরম গরম রুটি খাবু।’
জামিলা উনুনের পাড় থেকে হাঁক দেয়। ছেলে মরিচের চাটনি পছন্দ করে। সেও কাল থেকে মুখে কিছু তোলেনি। কোত্থেকে খাবার আসবে? কাজকাম নাই। দোকানপাঠ বন্ধ। কোত্থেকে যে কী হলো, মানুষজন অফিস-আদালত সব ছুটি। কবে খুলবে কে জানে। মিরন সকাল সকাল লেদ মেশিন কারখানায় যায়। সারাদিন কাজ করে। রাতে ফিরে শরীর আর কাপড়ের কালিঝুলি পরিষ্কার করে নেয়। জামিলা তখন ভাত বাড়ে। উচ্ছে ভাজা আর মসুরের ডাল। বাপ-বেটা দু-জনের পছন্দ। কোনোদিন মাছের টুকরো। জামিলার মন ভরে যায়। এই কয়েকদিন সেই জীবনছন্দ নেই। দোকান বন্ধ হয়ে গেল। সরকার বলে বাইরে বেরোন যাবে না। খুব বেশি দরকার না থাকলে ঘরে থাকতে হবে। জামিলা এসব কিছু বোঝে না। কাজের মানুষ ঘরে থাকলে খাবার আসবে কোত্থেকে? জামিলা নির্নিমেষ দক্ষিণের ঘরে তাকিয়ে থাকে। উনুনের আগুন ধীরে ধীরে ছাই হয়। তার মন বড় আনমনা। কী সব ভাবতে ভাবতে আবার দক্ষিণের ঘরে ডাক পাড়ে।
‘মিরন মিরন…ওই মিরন? আয় বাপ।’
‘মিরন ফির কোঠে? ওঁয় তো ঘরোত্‌ নাই।’
‘ওহ হো মোর মাথা খারাপ। ওঁয় তো রিলিপ আইনবার গেইচে। কাইল রাইতোত কইছে মোক।’
জামিলা বুঝি সম্বিত ফিরে পায়। আজ মন বড় উদভ্রান্ত। কেন এমন লাগে? রাস্তায় শজনের গাছে আরও দুটো কাক এসে জড়ো হয়েছে। সেগুলো অদ্ভুত চোখে নিচে তাকিয়ে থাকে। কী আছে সেখানে? জামিলা উঠে বসে। সুলতানও মুখে গামছা বেঁধে নেওয়ার জন্য আঙিনায় নামে। কী সব চিন্তা করে।
আইজ কি রিলিপ দিবি? মিরন কী কইচে তোক?’
‘হেরা তো কাল দিবা চাইছিল। মিরন পায় নাই। আইজ গেইচে, যদু দেয়।’
‘মুইও এ্যানা বাইরাও।’
‘এ্যালায় ফির কুন্ঠে যাইমেন? শরীর বলে চলোচে না…কুসঠি পড়ি থাকিমেন ফির।’
‘আ রে নহায়…যদু মুইহো কিছু পাঁও।’
‘হয় মেম্বর তোমাক দিবা তনে বসি আছে।’

(আগামীকাল সমাপ্য)

VN:R_U [1.9.22_1171]
রেটিং করুন:
Rating: 5.0/5 (2 votes cast)
VN:R_U [1.9.22_1171]
Rating: 0 (from 0 votes)
চালচোর, 5.0 out of 5 based on 2 ratings

ফেসবুক ইউজার মন্তব্য

মন্তব্য (ফেসবুক )

এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের,লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

৭ টি মন্তব্য (লেখকের ৩টি) | ৩ জন মন্তব্যকারী

  1. মুরুব্বী : ২৩-০৫-২০২০ | ১০:০০ |

    শুভেচ্ছা জানবেন প্রিয় গল্পকার মাহবুব আলী ভাই। বেশ কিছুকাল পর আপনার গল্প পেলাম শব্দনীড়ে। আপনার গল্পের মধ্যে জীবনের সঙ্গ এবং অনুষঙ্গ অর্থ্যাৎ বিবিধ দিক থাকে; যা আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের খুব খুব পরিচিত কথা-সমূহ বিশদ্ উঠে আসে। পড়া এড়িয়ে গেলে পাঠক গল্পের যে অসাধারণত্ব তা থেকে নিশ্চিত বঞ্চিত হবে। চলুক। https://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_good.gif

    VN:R_U [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)
    • মাহবুব আলী : ২৪-০৫-২০২০ | ৭:৫০ |

      আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা মুরুব্বী ভাই। চেষ্টা করছি নিয়মিত থাকার। একইসঙ্গে অন্য কাজও করতে হচ্ছে।

      শব্দনীড়-এ পাঠক লেখক অনেক কমে গেছে। অথচ ব্লগের সংখ্যাও কম। শুভেচ্ছা জানবেন।

      VN:R_U [1.9.22_1171]
      Rating: 0 (from 0 votes)
  2. ইসিয়াক : ২৩-০৫-২০২০ | ১২:৪২ |

    প্রিয় গল্পকার মাহবুব আলী ভাই আপনার গল্পগুলো সবসময় অন্যরকম মাত্রা পায়। 

    চমৎকার বাস্তবচিত্র।http://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_rose.gifhttp://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_rose.gifhttp://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_rose.gifhttp://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_rose.gifhttp://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_rose.gif 

    VN:R_U [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)
  3. ফয়জুল মহী : ২৩-০৫-২০২০ | ১৪:১২ |

    http://www.shobdonir.com/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_flowers.gif বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ

    VN:R_U [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)

মন্তব্য করুন