করোনায় একজন প্রবাসী (৩য় পর্ব)

আমার এলাকার এক হাই স্কুলের শিক্ষক সৌদিতে এসে ভেড়া পালনের কাজে পড়ে ভিসা দালালের মিথ্যার কারণে। সৌদিতে গিয়ে কাজের কথা শুনে উনি হতবাক। পরে অনেক দেন দরবার করে উনার সাবেক ছাত্ররা টাকা দিয়ে টিকেট কেটে দেশে ফেরত পাঠায়। উনার সৌদি মালিক কিছুতেই উনাকে রিলিজ দিতে কিংবা দেশে যেতে দিতে রাজি না। সৌদিয়ান বলে আমি ভিসা দিতে কোন টাকা পয়সা দাবি করি নাই। কারণ যে আসবে সে কষ্ট করবে তাই ভিসা বিনা পয়সায় দিয়েছি যাতে একজন মিসকিন কৃষক আসতে পারে। শিক্ষক কেন এই ভিসায় সৌদিতে আসলো। এইটা শিক্ষকের ভুল, আমার না। তাকে বুঝানো গেল না ভিসার দালাল মিথ্যা বলেছে। সৌদিয়ান বলে তোরা সবাই বাঙ্গালী মিথ্যাবাদী। যেহেতু আমার ভিসা নষ্ট হয়েছে এবং কাজের জন্য লোকও নাই তাই এখন এই কাজ করতেই হবে। ঊনি এর বাসায় ওর বাসায় পালিয়ে থেকেছেন কিছু দিন পরে এক পুলিশ অফিসারের সহযোগিতায় দেশে আসেন। এখনো উনি হাই স্কুলের শিক্ষকতায় নিয়োজিত। আসলে গরিবের জন্য শিক্ষাটাই অত্যন্ত উপকারী সম্পদ। যে কোন সময় এইটা বিক্রি করে আপনি খেয়ে পরে চলতে পারবেন। হয় আপনার কাছে অগাধ টাকা পয়সা থাকতে হবে না হয় যথেষ্ট শিক্ষা থাকতে হবে। আপনি অশিক্ষিত দীনহীন সময় পার করেছেন। তবুও মা বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। তাদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া কামনা করেন। কিন্তু বর্তমানের সন্তান বলবে কেমন মা বাবা যারা আমাকে পড়াশোনাও করতে দেয়নি সম্পদও রেখে যায়নি। তাদের ভুলের কারণে আজ আমি অশিক্ষিত, তাই আমি খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে কষ্ট পাচ্ছি। এই জন্য সন্তানকে আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত কর্মময় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চেষ্টা করুণ। যাতে সন্তান শিক্ষার সুফল পায়।

ভাই তোমার নাম জানা হলো না। আমি আর তুমি এক ভাষার মানুষ। মন খুলে চলবা আমার সাথে। আমি আবুল কালাম। বাংলাদেশে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি আমার বাড়ি।
এই লও বিড়ি খাও। পাতার বিড়ি এইটা। এত দিন একজন কথার বলার লোকও ছিল না। এখন তুমি আসায় ভালো লাগছে। চলো, ঘরের ভিতর দেখো। আমার মালিক লোক ভালো টাকা পয়সা ঝামেলা করে না। বৃহস্পতিবার বিকালে আসে পুরা পরিবার আবার শনিবার রাতে চলে যায়। এই দুই দিন আমার কাজ বেশী থাকে। দম ফেলতে পারি না। সে সরকারি বড় অফিসার তাই বিভিন্ন লোক আসে। খাওয়া – দাওয়া হয় প্রচুর। অনেকে আমাকে বকশিস দেয়।
আমি মন দিয়ে ফকির শাহর কথা শুনি। বাড়ির ভিতর সব কিছু এত দামি দামি যে চোখ ধাঁধানো। মনে হয় যেন রাজার মহল এইটা। দালানে রংয়ের কারুকর্ম, বাহারি বাতি, দামী ফার্নিচার। এইটাইতো স্বর্গ গরিবের জন্য।

দুইটা মেয়ে বিয়ের বয়স পার হয়েছে। এখনো বিয়ে দিতেছে না ছোট একটা পোলা আছে সেই বিরক্ত করে। ছেলেমেয়েদের পিছনে বেতনের অর্ধেক টাকা পনের দিনে শেষ করে। দামি দামি পোষাক কসমেটিক্স কিনে। এরপরও বিউটি পার্লারে যায় দুইবোন। বড় লোকের মেয়ে বড় লোকের কাছে বিয়ে দিবে। মোহরানাও অনেক বেশী দাবি করে। এমনিতে বিয়ে করতে হলে একজন লোকের বাড়ি গাড়ি সংসার খরচ যাবতীয় পরিপূর্ণ থাকতে হয়। এই মেয়েদের বিয়ের কথা হলে তাদের বাবা এক লাখ রিয়েল মোহরানা দাবি করে। আমাদের দেশে মোহরানার কথা, বিয়ের পরে আর কারো খবরই থাকে না। এইখানে কলমা পড়ার আগেই তার লেনদেন শেষ হয়। যাদের টাকা পয়সা বেশী থাকে বহু বিবাহ করে। এইটা ইসলামের সুন্নত। অথচ নামাজে অনেকে সুন্নত পড়েই না। আর বহু বিবাহ করে সুন্নত পালন করে। সবচেয়ে আচার্য্য কথা বৃদ্ধ বয়সেও যুবতী মেয়ে বিয়ে করে বাচ্চার বাপ হয়। ঘরের ভিতর নারীর নূন্যতম মর্যাদা নেই। তবে বাহিরে কেউ চোখ তুলেও তাকাতে পারে না। একসাথে কয়েকটা মেয়ে কালো বোরখা পরে চললে মনে হয় পেঙ্গুনের দেশ।

অথচ এই এরাবিয়ানই গরিব দেশ হতে গৃহকর্মী নিয়ে আসে বেশীর ভাগ যৌন কাজের জন্য। ফিলিপাইন, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশ হতে আসে এইসব গৃহকর্মী। ফিলিপাইনের বিধর্মী মেয়েরা আসার সময় সেই রকম প্রস্তুতি নিয়েই আসে। আবার সৌদিয়ান প্রচুর ফিলিপাইন ভ্রমনেও যায়। এইসব গৃহকর্মীদের বরাতে বিয়েও করে। থালা বাসন ধোঁয়া হতে ঘরের সমস্ত কাজ করতে হয়। ঘর পরিষ্কার, কাপড় পরিষ্কার, শিশুদের দেখাশোনা এবং ঘরের পাশে গ্রোসারি দোকানে যেতে হয় খরিদ্দার হয়ে। খুব কম সময় মিলে ঘুমানোর জন্য। ঘুমানোর জায়গা হয় রান্না ঘর কিংবা স্যাঁতসেঁতে অস্বাস্থ্যকর ঘরের কোণা। এর ফাঁকে ঘরের যুবকের যৌন লালসায় পড়তে হয়। বাপ ব্যাটা উভয়ের কুনজর থাকে গৃহকর্মীর উপর। প্রাপ্তবয়স্ক বয়স্ক পুরুষ মানে কাদ্দমা (গৃহকর্মী) ভোগ। আর এর পরিমাণ হয়তো শতকরা আশি জনের ঘরে। প্রতিবাদ করলে নির্যাতন নেমে আসে বর্বরোচিতভাবে। যেমন আমাদের দেশে বড়লোকের বউরা করে ছোট গৃহকর্মীদের উপর। খবুই কম সৌদি পরিবার আছে গৃহকর্মীদের যৌনসংগমে বিরত থাকে। এবং হাদিস কোরানে প্রভাবিত হয়। তবে ঘরের বাহিরে এদের চলাফেরা দেখলে মনে হবে না এরা এমন বর্বর। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শতকরা ৯৮জন লোকই পড়ে। এবং সুযোগ পেলে কোরান তেলাওয়াতও করে। চীনের নকল পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার এই সৌদি। আবার এরা হালাল হারাম খাবার খুজে চীনে গিয়ে। আজব কথা হলো এইসব গৃহকর্মীদের কোন আজনবী ( সৌদিয়ান নয়) এর সাথে কথা বলতে দেখলে তারা খুব রাগ করে। বলে এইটা হারাম, ইসলাম অবমাননা। প্রেম ভালোবাসায় জড়ালে পড়তে হয় ইসলামি আইনের ম্যারপ্যাচে। হয় জেল জুলুম এবং অবশেষে নিজ দেশে ফেরত।

হাসপাতালের আয়া কিংবা নার্সের কাজে যারা আছে তারা ভালো আছে। নার্সের জায়গা ফিলিপাইনের দখলে আর আয়ার দখলে বাংলাদেশ। রাস্তা ঝাড়ু, অফিস আদালত ঝাড়ু, বিমান বন্দর ঝাড়ু কিংবা বাথরুম ঝাড়ু সব বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন কর্মীর দখলে। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিক নেতারা কথায় কথায় বলে দেশ অনেক উন্নত যে কানাডার মত। এইসব ঝাড়ুদারের রেমিটেন্স পাঠানো টাকায় রাজনৈতিক নেতারা নিজ পরিবার কানাডায় রাখে বলে তারা স্বপ্নিল থাকে। হাসপাতালের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা ভালোবাসার মধু পান করতে গিয়ে করে অনৈতিক কাজ। এবং কখনো কখনো সীমাহীন প্রতারিত হয় মেয়েটা। যেমন এখন বাচ্চাসহ এক বছর ধরে জেলবাসী নোয়াখালীর জেসমিন। তার সহকর্মী কুমিল্লার ছেলের সাথে প্রেম তারপর বিয়ে।

(চলবে)

VN:R_U [1.9.22_1171]
রেটিং করুন:
Rating: 5.0/5 (1 vote cast)
VN:R_U [1.9.22_1171]
Rating: 0 (from 0 votes)
করোনায় একজন প্রবাসী (৩য় পর্ব), 5.0 out of 5 based on 1 rating

ফেসবুক ইউজার মন্তব্য

মন্তব্য (ফেসবুক )

এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের,লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

৪ টি মন্তব্য (লেখকের ২টি) | ২ জন মন্তব্যকারী

  1. আলমগীর সরকার লিটন : ৩০-০৭-২০২০ | ৯:৫০ |

    সৌদিয়ান নিয়ে ভাল লেখছেন মহী দা

    অনেক শুভেচ্ছা জানাই———

    VN:R_U [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)
  2. মুরুব্বী : ৩০-০৭-২০২০ | ১০:৪৩ |

    প্রবাস জীবনের না দেখা দিক বিষয় গুলোন আপনার লিখায় উঠে আসে। জানলাম।

    VN:R_U [1.9.22_1171]
    Rating: 0 (from 0 votes)

মন্তব্য করুন